প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ২৩:১৭

আমদানির খবরে ধানের দামে ধ্বস, ঋণ শোধে কৃষক কম দামে ধান তুলছেন বাজারে

এনামুল হক, বিশেষ সংবাদদাতাঃ
আমদানির খবরে ধানের দামে ধ্বস, ঋণ শোধে কৃষক কম দামে ধান তুলছেন বাজারে

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় রোপা-আমন মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে। মাঠে-মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌসুমি শ্রমিকরা। কিন্তু বাজারে সঠিক উৎপাদন মূল্য মিলছে না। চাল আমদানির খবর এবং বাজারে অতিরিক্ত যোগান চাপে ধানের দাম কমে গিয়ে নাজেহাল কৃষকরা, কারণ খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ঋণ পরিশোধের চাপ তো আছেই।

 

সরকার এ মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৪ টাকা, অর্থাৎ প্রতিমন ১,৩৬০ টাকা। কিন্তু শেরপুরের বিভিন্ন হাটে ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১,১০০–১,২৫০ টাকা মন দরে। চাষিদের অভিযোগ সরকার ঘোষিত দামের কোনো প্রভাব নেই বাজারে, ব্যবসায়ীরা নিজের মতো করে দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত যোগানের চাপেই ধানের দাম কমে গেছে। তবে চাল আমদানির খবরের প্রভাব আছে বলে জানান অনেকে।

 

উপজেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা যায়, নতুন ধান উঠতে থাকায় বাজারে যোগান হঠাৎ বেড়ে গেছে। ৫১ ধান বিক্রি হচ্ছে ১১৫০ থেকে ১২২০ টাকা দরে, স্বর্ণা পাঁচ বিক্রি হচ্ছে ১১২০ থেকে ১২৫০টাকা দরে, আর ৪৯ ধান বিক্রি হচ্ছে ১২৫০ থেকে ১৩২০ টাকা দরে, কাটারি নতুন ১৫৫০ থেকে ১৭০০ টাকা দরে কেনা বেচা হচ্ছে।অপরদিকে পুরাতন কাটারি ১৭৫০ থেকে ১৮১০ থেকে ১৮২০ টাকা দরে বেচা কেনা হচ্ছে। আর এই বাড়তি সরবরাহের কারণে প্রতিমন ধানের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যোগান বেশি, তাই দাম কম। হাটে স্বর্ণা-৫, ব্রি-৪৯, ব্রি-৫১, কাটারি, রনজিৎসহ বিভিন্ন জাঁতের ধান উঠতে দেখা গেছে।

 

চাষিরা বলছেন, মৌসুম জুড়ে সার, শ্রমিক ও বালাইনাশকের বাড়তি খরচ সামলাতে বহু কৃষক ধার-দেনা করেছেন। সেই ঋণ পরিশোধে তাড়াহুড়ো করেই তারা নতুন ধান বাজারে তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলার ভবানিপুর ইউনিয়নের কৃষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, এ বছর সার-বালাইনাশকের দাম বেশি, শ্রমিক মজুরিও আগের চেয়ে বেড়েছে। ঝড় ও বৃষ্টিতে ধান পরে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিঘায় ১৪ মন ধান ফলন হলেও খরচ তুলতে পারছি না। বাজারদর আশা অনুযায়ী না হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

 

আরেক কৃষক মিজানুর রহমান জানান,

এক সপ্তাহ আগেও স্বর্ণা-৫ বিক্রি করেছি ১২০০ টাকায়। আজ একই ধান ১১০০ টাকায় দিতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ব্যবসায়ীরা দাম আরও কমিয়ে রাখেন। অনেকেই কিস্তির ওপর ঋণ ও ধার নিয়ে চাষ করে। ফলে ঋণ পরিশদের চাপের কারনে তারা আগাম ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন।

চাল কিনতে আসা আব্দুল হালিম বলেন, সুবল লতা বস্তা বিক্রি হচ্ছে, ৪৮০০ টাকা আর কেজি ৫৩ টাকা, কাটারি বস্তা ৬৩০০ টাকা ও কেজি ৬৫ টাকা।

 

এ বছর ধানের আদ্রতা উপযুক্ত এবং ফলনও বেশ ভালো থাকলেও শেষের দিকে ঝড় ও বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু বাজারমূল্য না থাকায় উৎপাদন ব্যয় তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র বলছে, শেরপুরে এ বছর রোপা-আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৩২৫ মেট্রিক টন। অর্জন হয়েছে ২২ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। চাষ হয়েছে ব্রি–৩৪, ৪৯, ৫১, ৫২, ৭৫, ১০৩ এবং কাটারি, স্বর্ণা ও রনজিৎ জাতের ধান । এ পর্যন্ত ৬৫% ধান কাটা হয়েছে।

 

এবার হঠাৎ ঝর, বৃষ্টি ও বাতেসের কারনে তাদের ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান, ভবানিপুর ইউনিয়নের রুহুল আমিন, খামারকান্দি ইউপির আবু সাইদ ও আরমান হোসেন, তারা জানান, প্রতি বিঘায় ৫-৬ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আমাদের জনিতে স্বর্ণা ৫ ধান বিঘায় ২০ মন হতো কিন্ত এবার হয়েছে ১৩ মন। এক বিঘায় ধান উৎপাদনে তাদের খরচ ১১-১২ হাজার টাকা। এবার ধানে লোকসান হবে।

এদিকে ভোরা মৌসুমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ভারত থেকে ১ লাখ মেঃ টন চাল আমদানির খবর বাজারে ছরিয়ে পরায় ধানের দাম নিম্নমুখী।

 

ধানের পাইকাররা ধানের দাম কম বলছেন বলে জানান শেরপুরের তালতলায় হাটে ধান বেচতে আসা কৃষক অহিদুল। এই ভোরা মৌসুমে আমদানি করায় বাজারে চালের দাম ৫ টাকা কমলেও কৃষক ধান উৎপাদনে নিরুতসায়ী হবে বলে জানান অনেক কৃষক।

 

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, এ মৌসুমে সরকারিভাবে শেরপুর উপজেলায় মোট ধান সংগ্রহের লক্ষ্মাত্রা হচ্ছে ২৪০ মেট্রিক টন, চাল ৮ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। চাল প্রতি কেজি ৫০ টাকা। ধান ৩৪ টাকা প্রতি কেজি। ধানচাল সংগ্রহ অভিযান চলে দুই মৌসুমে। ধানের দাম পরিধারণ কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অ্যাপ এর মাধ্যমে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষক নির্ধারণ করা হয়। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে। লক্ষমাত্র পূরণ না হলে আগে আসলে আগে ভিক্তিতে কৃষকের থেকে ধান ক্রয় করা হবে। বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম কৃষকদের কিছুটা সহায়তা করবে।

 

উপজেলা সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার বলেন, এ বছর রোপা-আমনের উৎপাদন খুবই ভালো। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম ছিল। কৃষকদের জন্য মাঠ পর্যায়ে আমাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাজারদর কিছুটা কমলেও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সামগ্রিকভাবে কৃষক উপকৃত হবেন।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, ধান উৎপাদনে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ। মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধির জন্য আমাদের মৃত্তিকা গবেষণা ইন্সটিউট থেকে আমরা মাটি পরিক্ষার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। এটা বৃদ্ধি করা গেলে বগুড়ায় যে ধানটি উৎপন্ন হয় এটি মানেও বিশ্বে ও দেশের জন্য অন্যতম দৃষ্টান্ত হবে।

উপরে