মাত্র ৫ লাখ টাকায় বগুড়ায় প্রথম সফল বোন ম্যারো (স্টেম সেল) ট্রান্সপ্লান্ট
বগুড়ায় প্রথমবারের মতো সফলভাবে বোন ম্যারো (স্টেম সেল) ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়েছে। এ জটিল চিকিৎসায় খরচ হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। টিএমএসএস হেমাটোলজি অ্যান্ড বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারে এই চিকিৎসা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়, যা দেশের উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) বিকেলে টিএমএসএস হেমাটোলজি অ্যান্ড বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে জানানো হয়, গত ১৭ ডিসেম্বর রোগীর বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন করা হয়।
চিকিৎসাধীন রোগী রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ভান্ডাবাড়ি এলাকার ৬০ বছর বয়সী মিজানুর রহমান। জটিল এই স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টটি সফলভাবে পরিচালনা করেন হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ। অথচ একই ধরনের চিকিৎসায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে প্রায় ৭০ লাখ টাকা এবং ইংল্যান্ডে প্রায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো মিজানুর রহমানের রোগ শনাক্ত হয়। দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্টে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকতায় টিএমএসএস হেমাটোলজি অ্যান্ড বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারে তার চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসা প্রক্রিয়া, চ্যালেঞ্জ, চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে উন্নত ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা প্রদানে দেশের চিকিৎসকদের সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
অনুষ্ঠানে টিএমএসএসের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রোটারিয়ান ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, “বগুড়ায় প্রথম সফল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট শুধু টিএমএসএসের জন্য নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই সাফল্যের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করেছি—উন্নত চিকিৎসা এখন ঢাকার বাইরে থেকেও সম্ভব।”
হেমাটোলজি বিভাগের চিফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ বলেন, “যথাযথ অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল থাকলে আঞ্চলিক পর্যায়েও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল চিকিৎসা নিরাপদ ও সফলভাবে করা সম্ভব। আগামীতেও টিএমএসএস এ ধরনের আরও সাফল্য অর্জন করবে বলে আমি আশাবাদী।”
টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন বলেন, “এই অর্জন টিএমএসএসের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এর ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবার সুফল উত্তরাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।”
চিকিৎসা অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রোগী মিজানুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এক সময় আমি প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসকরা আমার জন্য হাল ছাড়েননি। মহান আল্লাহর কৃপায় এবং টিএমএসএসের চিকিৎসকদের যত্নে আজ আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। এত কম খরচে এমন চিকিৎসা সম্ভব—তা কখনো ভাবিনি।” তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে কর্মজীবনে ফিরতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এই সফল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে টিএমএসএস হেমাটোলজি অ্যান্ড বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারের কার্যক্রমে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পাশাপাশি বাংলাদেশে ক্যানসার ও রক্তজনিত রোগের উন্নত চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
