জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে- বগুড়ার জনসমাবেশে তারেক রহমান
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল, তারা এখন আবারও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে। তারেক রহমান বলেন, “আমরা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় তারা বারবার একইভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।”
সোমবার বিকেলে বগুড়া শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। ঠিক সেই সময়েই একটি রাজনৈতিক মহল সংসদের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি তারা কীভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। ৮৬ সালের নির্বাচনে তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ৯৬ সালেও স্বৈরাচারের সঙ্গে গিয়ে তারা একই কাজ করেছে। ২০০৮ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময়ও তারা সেই ভূমিকায় ছিল।” তিনি অভিযোগ করেন, “৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের ভূত এখন বিরোধী দলের ঘাড়ে চেপেছে। জনগণকে এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।”
বিগত ১৬ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সময়ে দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বিএনপিসহ বিভিন্ন দল আন্দোলনের মাধ্যমে সেই অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে “স্বৈরাচার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়” এবং জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পায়। পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, “মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে, দেশের লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। “আমরা সেই ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছি,” বলেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান এবং খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে আমরা ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে, বিএনপি সেটিতে প্রথম স্বাক্ষর করেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল সংসদ ও বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। “তারা নারীর উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা বা প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে কথা বলে না, তারা শুধু জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চায়,” বলেন তিনি।
এর আগে সরকার প্রধান হিসেবে প্রথম বগুড়া সফরে দিনভর একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তারেক রহমান।
সকালে সড়কপথে বগুড়ায় পৌঁছালে জেলা প্রশাসক ও দলীয় নেতারা তাঁকে স্বাগত জানান। শহরের প্রবেশমুখ থেকে সাতমাথা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। তিনি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
এরপর সার্কিট হাউস থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে তিনি বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নবনির্মিত অ্যাডভোকেটস বার ভবনের উদ্বোধন করেন এবং সাত জেলায় ই-বেইল বন্ড কার্যক্রম চালু করেন।
তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের অধিকার।” বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। পরে আবারো সকলের মাঝে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পায়ে হেঁটে পৌরসভা প্রাঙ্গণে পৌঁছে তিনি বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়। তিনি শহরকে পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
দুপুরে তিনি গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে তাঁর পৈতৃক ভিটায় যান। প্রায় দুই দশক পর সেখানে ফিরে স্থানীয়দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সেখানে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় তিনি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেন এবং খাল খনন প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন। পরে একটি স্থানীয় হাসপাতালের উদ্বোধনও করা হয়। এদিন গাবতলীতে তিনি ৯১১ জনের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন। এ কার্ডের মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবার মাসিক আর্থিক সহায়তা পাবে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই সফরে বগুড়াবাসীকে বেশ কিছু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়ে যান তিনি। জনসভায় তিনি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণ শিগগিরই শুরু করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চলাচল চালুর মাধ্যমে কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান। তিনি আরও বলেন, বগুড়ায় কৃষি, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
জনসভা শেষে তিনি বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন এবং একটি কেন্দ্রীয় মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
