১৮ বছর পর ভোটের উৎসব: বগুড়া চেম্বার নির্বাচনে ব্যবসায়ী রাজনীতির নতুন সমীকরণ
এক সময় বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাচন ছিল জেলার ব্যবসায়ীদের অন্যতম উৎসব। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ ধরে সেই ভোটের পরিবেশ হারিয়ে যায়। একের পর এক কমিটি গঠিত হলেও খোলেনি ভোটের বাক্স। অবশেষে ১৮ বছর পর আবারও নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন জেলার ব্যবসায়ীরা।
আগামী ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। এতে এক হাজার ৭৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সোমবার প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে।
নির্বাচনে ১২টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৮ জন প্রার্থী। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সভাপতি পদ। একদিকে বিএনপি সমর্থিত ‘বাদল-হিরু প্যানেল’, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ‘সেলিম-এরশাদ প্যানেল’ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রভাব থাকা ব্যবসায়ী অঙ্গনে এবার ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের প্রতিযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সভাপতি পদে গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমএসএম আতিকুর রহমান বাদল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিম রেজা পেয়েছেন ছাতা প্রতীক। সহসভাপতি পদে আনারস প্রতীক নিয়ে লড়ছেন হামিদুল হক চৌধুরী হিরু। একই পদে হারিকেন প্রতীক পেয়েছেন এরশাদুল বারী এরশাদ, মোমবাতি প্রতীক পেয়েছেন মামুনুর রশিদ মামুন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহামুদুর রহমান শিপনের প্রতীক খেজুরগাছ।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে বিভিন্ন পদ থেকে ১৬ জন প্রার্থী সরে দাঁড়ান। ফলে চূড়ান্তভাবে সভাপতি পদে ২ জন, সহসভাপতি পদে ৪ জন এবং পরিচালক পদে ২২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। পরিচালক পদে দুই প্যানেলের বাইরে চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও মাঠে থাকায় ভোটের সমীকরণে তাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বগুড়া চেম্বারে সর্বশেষ সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৭ সালে। এরপর ২০০৯ সালে মমতাজ উদ্দিন এবং ২০১৩ সালে তার ছেলে মাসুদার রহমান মিলন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন ভোটবিহীন নেতৃত্ব নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচন আয়োজনের দাবি জোরালো হয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রশাসক নিয়োগ এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের মাধ্যমে ভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সেলিম-এরশাদ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী সেলিম রেজা বলেন, “অতীতের মতো আর বিনা ভোটে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত হলে আমরা বিজয়ী হব।”
অন্যদিকে বাদল-হিরু প্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থী হামিদুল হক চৌধুরী হিরু বলেন, “দীর্ঘদিন চেম্বারকে একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। এবার ব্যবসায়ীরাই তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।”
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আছিয়া খাতুন জানান, দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। আগামী ৫ জুলাই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, এই নির্বাচন শুধু নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের নয়; বরং বগুড়ার ব্যবসায়ী সমাজে দীর্ঘদিনের ‘মনোনয়ন সংস্কৃতি’ থেকে গণতান্ত্রিক ভোটের সংস্কৃতিতে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
