প্রকাশিত : ২৮ জুন, ২০২৬ ১২:২০
বগুড়ায় নবজাগা চর হুমকিতে, যমুনায় বালু উত্তোলন বন্ধে নেই অভিযান
নিজস্ব প্রতিবেদক
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চর চন্দনবাইশা মৌজার নবজাগা চর সংলগ্ন যমুনা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ তুলে তা বন্ধে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের অভিযোগ, যমুনায় প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বাঙালি নদীতে। এতে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া এক আবেদনে স্থানীয়দের পক্ষে মো. আলেপ উদ্দিন জানান, ১৯৯৫ সালের ভয়াবহ যমুনা নদীভাঙনে চর চন্দনবাইশা মৌজার ১ থেকে ৫ নম্বর সিটের অধিকাংশ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর সেখানে নতুন করে চর জেগে উঠেছে। বর্তমানে ওই চরে কাশবনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্ভিদ জন্মেছে এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার আশা সৃষ্টি হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, কিছু বালু ব্যবসায়ী নবজাগা চর সংলগ্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। এতে চরটি আবারও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চরটি ধ্বংস হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং-১০৫১৯/২০২৪-এর আদেশের ভিত্তিতে নারাপালা ও কর্ণিবাড়ী মৌজার নির্দিষ্ট দাগভুক্ত বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের আদেশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৫ জুন পর্যন্ত সাত মাস বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে অনুমোদিত তফসিলে চর চন্দনবাইশা মৌজার ১ থেকে ৫ নম্বর সিটের কোনো জমির উল্লেখ নেই বলে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন।
চর চন্দনবাইশা জেগে ওঠা চরাঞ্চলের জনগণের পক্ষে দেওয়া আবেদনে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, সংশ্লিষ্ট ড্রেজার জব্দ এবং নবজাগা চর সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
কর্ণিবাড়ি এলাকার নয়া মিয়া, লিয়াকত আলী সরদার ও বিলকিসসহ স্থানীয়রা জানান, তাদের বাড়িঘর একসময় চরে ছিল। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা এখন নদীর তীরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চর কাটা বন্ধ হলে তারা আবারও নিজেদের পৈত্রিক জমিতে ফিরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
কর্ণিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের অদূরে নাড়াপাড়া এলাকার চলমান বালু পয়েন্টে "বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত বালুমহাল" উল্লেখ করে মেসার্স ফাহিমা ট্রেডার্সের নামে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত এলাকার বাইরে অবৈধভাবে নতুন পয়েন্ট চালু করে দেদারসে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মেসার্স ফাহিমা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও সাবেক ইউপি সদস্য এফাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বালু পয়েন্টের এক ম্যানেজার জানান, মূল মালিককে তিনি চেনেন না, সিরাজুল নামে একজন বিষয়টি দেখভাল করেন।
স্থানীয় একটি সূত্রে কর্ণিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন দিপনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, "আগে বালু উত্তোলনের ঘটনায় আমি নিজেই মামলার আসামি হয়েছিলাম। তাই এখন এ কাজের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে প্রশ্ন হলো, আগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এখন যারা অবৈধভাবে বালু তুলছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? এখানে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে কি না, সেটিই এখন মানুষের প্রশ্ন।"
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, "বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের ঘটনাস্থলে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা যেসব অভিযোগ পাচ্ছি, সেসব স্থানে অভিযান পরিচালনা করছি।"
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার কিছুক্ষণ পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাঙালি নদীর একটি বালু পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। অথচ যমুনা নদীর অভিযোগকৃত এলাকাগুলোতে কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে অভিযোগ যমুনায়, সেখানে অভিযান কেন বাঙালি নদীতে? অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা কি কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয়ে থেকে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
