বগুড়ায় চেক-স্ট্যাম্প নিয়ে বিরোধ, মামলা-হয়রানির আশঙ্কায় সাবেক ইউপি সদস্য
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর-বাঙ্গালপাড়া গ্রামে গৃহবধূকে এসিড নিক্ষেপের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপস-মীমাংসা, অর্থ লেনদেন, চেক ও স্ট্যাম্প হস্তান্তর নিয়ে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিরোধের জেরে দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. মতিয়ার রহমান মতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মামলা ও হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর কৃষ্ণচন্দ্রপুর-বাঙ্গালপাড়া গ্রামের গৃহবধূ মোছা. চাম্পা বেগম (৩৫) তাঁর স্বামী মো. জুয়েল মিয়ার (৪০) বিরুদ্ধে এসিড নিক্ষেপের অভিযোগ করেন। পরে ঘটনাটি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আপসের সময় মোট ১০ লাখ টাকার সমঝোতার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং ২ লাখ টাকা তৃতীয় পক্ষকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই অর্থ শালিসদার মো. মোমিন, পিতা মৃত আমজাদের কাছে জমা রাখা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সোনাতলা শাখার ১৭১৫৫২৪ ও ১৭১৫৫২৫ নম্বরের দুটি চেক দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরে চেক দুটি সাবেক ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান মতির কাছে রাখা হয়।
পরবর্তীতে গৃহবধূ চাম্পা বেগমের ভাই এনামুল হক মো. মোমিনের ওপর আস্থা রাখতে না পারায় মতির কাছ থেকে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের ৩৩৭০৫৬, ৩৩৭০৫৭ ও ৩৩৭০৫৮ নম্বরের তিনটি চেক গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনটি ১০০ টাকার স্ট্যাম্পও নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আপসের দিন বাদীপক্ষকে ২ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে বিবাদীর জামিনের সময় আরও ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা মামলা নিষ্পত্তির পর দেওয়ার কথা রয়েছে বলে তাঁদের ভাষ্য।
এ ঘটনায় সাক্ষী হিসেবে মো. মোমিন, মো. আলাল মহুরী, মো. আমিনুল ইসলাম মিঠু ও মকুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
পারিবারিক বিরোধে নতুন জটিলতার অভিযোগ
এদিকে সাবেক ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান মতির সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আখির পারিবারিক বিরোধের পর চেক ও স্ট্যাম্পকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মতি।
মতির দাবি, তাঁর শ্বশুর এনামুল হক বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা ও পারিবারিক প্রয়োজনের কথা বলে তাঁর কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নেন। এ সময় কয়েকটি গরু নেওয়া এবং গরু বিক্রির অর্থ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, একটি গরুর মূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং আরেকটির মূল্য প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া আরও তিনটি গরু তাঁর স্ত্রী ও নানা শ্বশুর রুকু মিয়ার মাধ্যমে ট্রাকে করে রংপুরে পাঠানো হয়। এসব গরু ও অর্থ বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
মতিয়ার রহমান মতি আরও অভিযোগ করেন, দাম্পত্য বিরোধের সুযোগে তাঁর বাড়ির বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব মালামাল প্রথমে পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া এনামুলের বাসায় রাখা হয়। পরে তাঁর নানা শ্বশুর রুকু মিয়া সেগুলো নিজের বাসায় নিয়ে যান।
এ ছাড়া গাড়ি কেনার জন্য রাখা ১৫ লাখ টাকা তাঁর স্ত্রী আখি, তাঁর কথিত পরিচিত জুলফিকার রহমান জুয়েল এবং শ্বশুর এনামুল হক ও নানা শ্বশুর রুকু মিয়ার যোগসাজশে নিয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন মতি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মতির দাবি, গাড়ি কেনার জন্য অর্থ রাখার বিষয়টি সম্পর্কে মতিয়ার রহমান পিন্টু ও আলিম অবগত রয়েছেন।
মামলা ও হয়রানির হুমকির অভিযোগ
মতি অভিযোগ করেন, তাঁর স্ত্রী বর্তমানে রংপুরের সদরপাড়ায় বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং তাঁকে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানো ও হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া তাঁর স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির পক্ষ বিভিন্ন সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও অর্থ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মতি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এভাবে ৭ লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া গ্রামের মো. জিন্নারের কাছ থেকে প্রায় ৫০ হাজার, মো. আনারুলের কাছ থেকে ১০ হাজার এবং মো. এনামুলের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা কিস্তিতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আখি তাঁর ভাইকে কক্সবাজার পাঠানোর কথা বলে এনামুলের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
মতি আরও জানান, নাংলুহাট শাখার ব্রিজ ব্যাংক থেকে তাঁর নানা শ্বশুর রুকু মিয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রমাণ সংরক্ষণের দাবি
সাবেক ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান মতি বলেন, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করা এবং এলাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান ও রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। মামলা, হামলা ও হুমকির ভয় দেখিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চেক, স্ট্যাম্প, অর্থ লেনদেনের তথ্য, কাগজপত্র ও ভিডিও ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এসব প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
