প্রকাশিত : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৪৩

বগুড়ায় শতভাগ পাসের আড়ালে ‘দুর্বল’ শিক্ষার্থী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ

প্রিটেস্টে ফল খারাপ হলেই ক্লাসে নিষেধ, অন্য স্কুলে যাওয়ার চাপ
আল- মামুনঃ
বগুড়ায় শতভাগ পাসের আড়ালে ‘দুর্বল’ শিক্ষার্থী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ
বগুড়ার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের হার ধরে রাখার লক্ষ্যে প্রিটেস্ট পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না করা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস থেকে দূরে রাখার এবং অন্য বিদ্যালয়ে চলে যেতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রিটেস্ট পরীক্ষায় ফল খারাপ হলেই কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি তাদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ বা চাপ দেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে। আগামী বছর তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা।
অভিভাবকদের প্রশ্ন, একটি পরীক্ষায় ফল খারাপ হওয়াকে শিক্ষার্থীর অযোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা না করে তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিশেষ পাঠদান, অতিরিক্ত ক্লাস ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই কি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়? বছরের পর বছর মাসিক বেতন, বিভিন্ন ফি ও সেশন ফি নেওয়ার পর এসএসসির আগে ‘দুর্বল’ শিক্ষার্থীর দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কতটা যৌক্তিক—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
 
মতলুবর রহমান নামের এক অভিভাবক বলেন, “একটি পরীক্ষায় ফল খারাপ হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থী অযোগ্য—এমনটা হতে পারে না। তার কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করে সহযোগিতা করা উচিত। ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।
 
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রিটেস্ট কোনো চূড়ান্ত পাবলিক পরীক্ষা নয়। বরং এ পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা। ফলে ফল খারাপ করা শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের জন্য বিশেষ ক্লাস, অতিরিক্ত অনুশীলন ও একাডেমিক সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান এসএসসিতে শতভাগ পাসের হার দেখানোর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আগেই সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো দেখালেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি এবং পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
 
একটি বিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু শতভাগ পাসের ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দুর্বল শিক্ষার্থীকে কতটা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, ঝরে পড়া রোধে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান কেমন—এসব বিষয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।
এদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, নিয়মিত পাঠদানের পরিবর্তে কোচিংনির্ভরতা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
বগুড়া জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক) মো. রমজান আলী আকন্দ বলেন, “শতভাগ পাসের অজুহাতে স্কুলের নিয়মিত শিক্ষার্থীকে স্কুলে ক্লাস করতে নিষেধ করা বা অন্য কোনো স্কুলে যেতে বাধ্য করার সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ পেলে অভিযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন ফি, শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উপরে