প্রকাশিত : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:০২

দুই দশক ধরে শামুকখোল পাখির নিরাপদ ঠিকানা ক্ষেতলালের কানাইপুকুর

মোঃ হাসান আলী, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট
দুই দশক ধরে শামুকখোল পাখির নিরাপদ ঠিকানা ক্ষেতলালের কানাইপুকুর

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম কানাইপুকুর। একসময় নিভৃত এই গ্রামটি এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে হাজারো শামুকখোল পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই পাখির কলোনিকে ঘিরে কানাইপুকুর যেন পরিণত হয়েছে পাখিদের গ্রামে।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামের আলহাজ্ব আব্দুস ছোবহান মন্ডলের ঐতিহ্যবাহী বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে রয়েছে ঘন গাছপালা, সুবিশাল মেহগনি ও আমগাছ এবং বাঁশঝাড়। এসব গাছেই প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে উড়ে এসে আশ্রয় নেয় বিপন্ন প্রজাতির শামুকখোল পাখি। তাদের সঙ্গে এখানে আসে বক, কানিবক, পানকৌড়ি ও শঙ্খচিলসহ নানা প্রজাতির দেশীয় পাখি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি মৌসুমে এই এলাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শামুকখোল পাখি আশ্রয় নেয়। পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বাড়ির মালিক ও স্থানীয়দের সহযোগিতা এবং ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে এই অনন্য পাখির অভয়াশ্রম।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কানাইপুকুরে পাখির এই কলোনি গড়ে ওঠার গল্প প্রায় দুই দশকের পুরোনো।

 মন্ডল পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৭-০৮ সালের দিকে এক বর্ষায় কয়েকটি পথভোলা শামুকখোল পাখি পুকুরপাড়ের উঁচু গাছে এসে আশ্রয় নেয়। পরিবারের সদস্যরা পাখিগুলোকে তাড়িয়ে না দিয়ে নিরাপদে থাকতে দেন।

এরপর থেকেই প্রতিবছর একই সময়ে পাখিগুলো এখানে আসতে শুরু করে। নিরাপদ পরিবেশ ও মানুষের ভালোবাসায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যা। একপর্যায়ে কানাইপুকুর হয়ে ওঠে শামুকখোলের বড় একটি প্রজনন কলোনি।

বর্তমানে আব্দুস ছোবহান মন্ডলের ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর আলম মন্ডল পাখিগুলোকে পরম মমতায় আগলে রাখছেন। তিনি বলেন, পাখিগুলো এখন আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে গেছে। কেউ যেন তাদের ক্ষতি বা বিরক্ত না করে, সেদিকে আমরা কড়া নজর রাখি।


প্রতিবছর এপ্রিলের শুরুতে শামুকখোলের দল কানাইপুকুরে ফিরে আসে। পুকুরপাড়ের উঁচু গাছগুলোতে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ার প্রস্তুতি নেয় তারা। মে থেকে জুনের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ছানারা উড়তে শেখার সময় পুরো এলাকা পরিণত হয় পাখির কলকাকলিতে মুখর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাখিরা অন্য গন্তব্যে চলে যায়। তবে এপ্রিল এলেই আবার ফিরে আসে চেনা ঠিকানায়।


কানাইপুকুর গ্রামের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা প্রতিনিয়ত উপভোগ করেন হাজারো পাখির বিচরণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির ডাক, ডানা ঝাপটানো এবং গাছে গাছে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য মুগ্ধ করে স্থানীয়দের। কৃষক থেকে শুরু করে প্রবীণ বাসিন্দারা মনে করেন, শামুকখোল এখন তাদের গ্রামের আত্মপরিচয় ও গর্বের অংশ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহিনুর ইসলাম বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে কানাইপুকুরের এই পাখির কলোনি প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এলাকায় পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি বলেন, কানাইপুকুরের এই পাখি কলোনি প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। পাখিদের সুরক্ষা, গাছে নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং কলোনিটিকে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

উপরে