অবৈধ দখলদারীত্ব আর অযত্ন অবহেলায় বিলীনের পথে মহাকালের সাক্ষী হয়ে থাকা রাজা বিরাট রাজপ্রসাদের শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু
গাইবান্ধা জেলার প্রসিদ্ধ উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ। প্রাচীনত্বের দি েেথকে স্ব-মহিমায় ভাস্বর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও ইতিহাস খ্যাত উপজেলার পরিচয় সামান্য বর্ণনায় যবনিকা টানা কঠিন। ঐতিহাসিক ও কালক্রমে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া স্থাপনার হিসাব করলে করতোয়া-কাটাখালী নদীর তীরে গড়ে উঠা প্রাচীন জনপদ রাজাবিরাট, বর্ধনকুঠি রাজবাড়ী, ববনপুর জমিদারবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ ও সৌন্দর্যমন্ডিত মসজিদ মন্দির সমূহ এই এলাকার মানুষকে এখনও গৌরবান্বিত করে।
ঐতিহাসিক এ সমস্ত নিদর্শন দেখলে বাস্তবিকভাবে অবচেতন মনকে নাড়া দেয়। এই অঞ্চলের সন্তান হিসেবে আমার অনুসিন্ধুৎস মনকে খানিকটা নাড়া দিয়েছে । শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ উপজেলার সোনালী গৌরবান্বিত ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে শুরুতেই বলে রাখছি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব সেটা নিয়ে লিখতে গিয়ে নানা মুখি সমস্যার সম্মূখীন হয়েছি। বিশেষ করে তথ্য উপত্তের দূষ্প্রাপ্যতার ব্যাপারে যথেষ্ঠ ছোটাছুটি করতে হয়েছে। এছাড়াও সঠিক তথ্য পেতে স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ অনেকের সাথে কথা বলতে হয়েছে ।
আমারা যদি গোবিন্দগঞ্জ তথা গাইবান্ধা বা উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনাগুলোর কথা বলি তাহলে সবার উপরে স্ব-মহিমায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শাখাহার ইউনিয়নের রাজাবিরাট রাজবাড়ির কথা সবার উপরে চলে আসবে । এই বিরাট রাজার বিভিন্ন পৌরানিক কাহিনী শতাব্দী পর শতাব্দী লোক মুখে চলে আসছে। প্রাগৈতিহাসিক বিরাট নগর এখন রাজাবিরাট নামে খ্যাত। গোবিন্দগঞ্জ থানা সদর হতে ১৬ কি:মি: পশ্চিমে এই নগরের অবস্থান। মৌজা বরট্ট। জমির পরিমান ৬৭৩.৩৬ একর । এখানেই লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন কালের ঐশ্বর্যশালী নগর, রাজবাড়ী, মন্দির এর ধ্বংসস্তুপ। এ ছাড়াও লোক মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এ সম্পর্কিত অসংখ্য কাহিনী। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, নবাব শায়েস্তা খার সময় সরকার ঘোড়াঘাট ৯ আনা আর ৭ আনা আংশে ভাগ হলে আলীগাঁও পরগনার এই বরট্ট মৌজা বর্ধনকুঠি জমিদারের অধীনে চলে যায় । সেই থেকে এখনও অবধি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সীমানার মধ্যেই রয়েছে। প্রাচীন কালে বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ নামে কোন দেশ ছিলনা। কেবলমাত্র এই অঞ্চেলের বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কামরূপ, পঞ্চগৌড়, বরেদ্র, রাঢ়,বঙ্গ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে এসব এলাকার জনপদ একসঙ্গে মিলে “বাঙালা ” নামে সর্বপ্রথম পরিচিতি লাভ করে। এই বাঙালা নাম পরিবর্তিত হয়ে পূর্ব বাংলা অধুনা বাংলাদেশ নাম ধারণ করে। মৎস দেশের অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মত পার্থক্য থাকলেও জনশ্রুতি ও ইতিহাসের তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী রাজা বিরাট উল্লেখিত পুন্ড্ররাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্রাট অশোকের আমলে পুন্ড্রনগর সম্রাজ্যের অধীনে ছিল বলে গন্য করা হয়। তার সময় কয়েকজন চৈনিক তীর্থযাত্রী পৌন্ড্রবর্ধন ভ্রমন কালে বিভিন্ন স্থানে বহু অশোক স্তম্ভ দেখতে পেয়েছিলেন।
৬৩৮ খিস্টাব্দে রাজা শশাংখের গুপ্তরাজ্য ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গেও কিছু অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন গৌর রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রাজা শশাংখের পর মৃত্যুর পর পাল বংশ দীর্ঘকাল এ অঞ্চলে রাজত্ব করে। পাল রাজারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ছিলেন। পাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার সময়ই অষ্টম শতাব্দির শেষ ভাগে (৭৪০-৮০০) দক্ষিন পূর্ববাংলার সমতটে দেববংশ নামে একটি রাজবংশ প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করতেন। রাজা বিরাট এই দেব বংশ ও পুন্ড্রনগরের আওতাভুক্ত ছিল বলে ধারণা করা যায়। ইতিহাস অপরাপর সূএে জানা যায়, মৎস দেশের অধিপতি রাজা বিরাট ছিলেন প্রাগজ্যাতিষের রাজা ভগদত্তর সমসাময়িক। এছাড়া ইতিহাসে হিন্দু পৌরানিক কাহিনীর সংশ্লিষ্ঠ রয়েছে।
কথিত আছে অনধিক ৩০০০ হাজার বছর পূর্বে কুরু-পান্ডব যুদ্ধ সংঘটনের আগে কৌরবদের চক্রান্তে মহা ভারতের পঞ্চপান্ডবদের ১২ বছরের বনবাস দেয়া হয় । অজ্ঞাতবাস কালে পঞ্চপান্ডবরা ছদ্মবেশে এসেছিলেন মৎসদেশের রাজধানী বিরাট নগরে। পান্ডবগণ ছদ্মবেশে রাজপুরীতে বিভিন্ন পদে চাকুরী গ্রহন করে। পরে তাদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়। বিরাট রাজা সব জানার পর পান্ডবদের পক্ষে কুরু-পান্ডব যুদ্ধে জড়িয়ে পরেন। যুদ্ধ শুরু হলে রাজা বিরাট ও তার পূত্র কুমার উত্তর ও যুদ্ধে স্ব-শরীরে অংশ নেন। যুদ্ধে রাজা বিরাট, তাঁর পূত্র কুমার উত্তরও বিপক্ষে দলে যোগদান করায় প্রাগজ্যাতিষের রাজা ভগদত্ত নিহত হন। এরপর থেকে মৎসদেশের ভাগ্যে বিপর্যয় দেখা দেয়। এই ঘটনার একটু ফিছনে ফিরে তাকালে মহাভারত ও সাওতাল গ্রন্ধ সত্যং শিবং সহ বহু পুরানে পঞ্চ পান্ডবদের আগমনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে রাজাবিরাট সহ এর পাশর্^বর্তী কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা রয়েছে। পুরান মতে এই স্থানের উপবনেই পান্ডববরা ছদ্মবেশ ধারণ, ছদ্মনাম গ্রহন ও পরামর্শ করতেন বলে জানা যায়। এই বানেশ্বর শ্মশানের সমীবৃক্ষে পান্ডবগণ বানেশ^র প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্র লুকিয়ে রেখে রাজা বিরাটের দরবারে চাকুরি প্রার্থনা করেন। এছাড়া এই মৎসদেশের রাজধানীর আশে পাশে আরও অসংখ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্থাপনার খোঁজ মেলে; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধনডুবা পুকুর । কথিত আছে বিরাট রাজবাড়ির ধন রত্ন লুন্ঠন করে রাজ দরবারের পাশে নহর ডোবা বর্তমানে ধনডোবা পুকুরে সাময়িক ভাবে লুকায়িত ছিল। সেই হতে আজও সেই পুকুর ধনডুবা পুকুর নামেই পরিচিত। বিগত ১৯৮৯ সালে এই ধন ডুবা শুকিয়ে গেলে স্থানীয়রা পুকুর খনন কালে বড় আকারের একটি ফলক দেখতে পায় , যাতে ২৪টি মূর্তি খোদিত রয়েছে। বর্তমানে এটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মন্দির-প্রাসাদসহ বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরই উদাসীন থেকেছে। এটা খুবই পীড়াদায়ক। এই নির্লিপ্ততা চলতে থাকলে অযত্ন-অবহেলা আর দখল-দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ে অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে কালের সাক্ষী আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাকি স্মারক স্থাপনার অবশিষ্ঠাংশ। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র একদা আক্ষেপ করে লিখেছিলেন- বাঙালীর কোন ইতিহাস নেই। এক্ষেত্রে তিনি নিশ্চয়ই লিখিত ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একথাও সত্য যে, বাঙালীর ইতিহাস লেখার জন্য যথোপযুক্ত উপকরণের বড়ই অভাব। এই জল-কাদা, মারী-মড়কের দেশে ঝড়ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, বৃষ্টি-বাদল, বন্যা, নদ-নদীর একূল ভাঙ্গা ওকূল গড়ার দেশে ইতিহাসের স্বপক্ষে পাথুরে প্রমাণ বুঝি বেশিদিন টেকসই হয় না। মহাকালের গহ্বরে প্রায়ই হারিয়ে যায় অথবা চাপা পড়ে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গাগড়া খেলায়।
সময়ের আবর্তে শাসক আসে, শাসক যায়। নতুন শাসক ক্ষমতার মসনদে বসে লিখতে চায় নিজের মনমতো ইতিহাস। পুরনো শাসকদের ছুড়ে ফেলতে চায় আস্তাকুড়ে, ভেঙ্গে ফেলে পুরনো পুরাকীর্তি, গড়ে তোলে নিজের স্থাপনা। হায়, সে নিজেও জানে না কালের প্রবাহে একদিন অনিবার্য তাও ধূলিসাৎ হবে! এর পাশাপাশি আরও একটি কথা বোধ করি প্রণিধানযোগ্য- বাঙালী বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি। ইতিহাসের সবকিছু তারা অতি দ্রুত ভুলে যায়; যার যা প্রাপ্য যতটুকু প্রাপ্য, ততটুকু দিতে কেন যেন বড়ই কৃপণ ও কুণ্ঠিত।
অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন সময় নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরাকীর্তিগুলো। অথচ যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ইতোমধ্যে পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সিংহভাগ বিলীন হয়ে গেছে আর বাকি টুকুও দখলদারদের শকুনী নজরে। এখনও যেগুলো আছে সেগুলোও বিলীন হওয়ার পথে। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় সময়; কিন্তু প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো সময়ের চিহ্নকে জীবন্ত করে রাখে। অথচ দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলার কারণে এসব পুরাকীর্তি কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনা বেদখলে চলে গেছে। কিন্তু এসব স্থাপনা-পুরাকীর্তির যথাযথ সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে তা কেবল ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্মারক হয়েই থাকত না, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নজর কাড়তে পারত। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো আমরাও এসব স্থাপনা ও নিদর্শনকেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারতাম।
সরকারের এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষনের উদ্যেগ নিলে , পর্যটক বা দর্শনার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে তা থেকে ভাল অঙ্কের রাজস্ব পাওয়া যাবে। সেই সাথে সারাদেশের আনাচে-কানাচে যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরাকীর্তি এখনও আছে, সেগুলো সংরক্ষণ করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের অতীত গৌরবের সাক্ষী। এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। এর জন্য উদ্যোগী হতে হবে সরকারকেই। সারাদেশের গ্রামেগঞ্জে যেসব প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে এগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ঐতিহ্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অবহেলা ঔদাসীন্যে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস হওয়া শুধু দুঃখজনকই নয়, জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম অগৌরব জনকও। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয়, আমাদের দেশের অনেক মূল্যবান পুরাকীর্তি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে অন্য দেশে পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ আছে। বাংলাদেশের পুরাকীর্তির পাচার রোধ এবং এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ব অধিদপ্ততরকে আরও বেশি সতর্ক এবং মনোযোগী হতে হবে। সেইসঙ্গে পাচার চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিচর্যার পাশাপাশি প্রাপ্ত পুরাকীর্তি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে। সেসব নিদর্শন থেকে নতুন প্রজন্ম অতীত ইতিহাসকে জানতে পারবে।
দৈনিক চাঁদনী বাজার / সাজ্জাদ হোসাইন
