ভেজাল লাচ্ছায় ছয়লাব শেরপুরের বাজার
চলছে লাচ্ছা সেমাইয়ের মরশুম। আর কিছুদিন পরেই ঈদুল ফিতর। রোজার শুরু থেকেই লাচ্ছা সেমাই তৈরীর ধুম পরে যায় সব জায়গাতেই। আর সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তৎপর হয়ে ওঠে অসত উপায়ে টাকা উপার্জনের লক্ষ্যে। বগুড়া জেলা জুড়ে শেরপুরের তৈরী লাচ্ছা সেমাই বেশ জনপ্রিয়। প্রস্তুতকারকদের মতে প্রতি বছর বাজারের মোট চাহিদার অধিকাংশ লাচ্ছা সেমাই ঈদুল ফিতরকেন্দ্রিক। আর তাই ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শেরপুর শহর ও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অবৈধ লাচ্ছা সেমাইয়ের কারখানা। যেখানে পরিবেশ, উপকরন সামগ্রী, কোনো দিকেই লক্ষ্য রাখা হচ্ছে না। অস্বাস্থকর পরিবেশে পোড়া পামওয়েল দিয়ে ভাজা লাচ্ছা লেমিনেটিং করা চকচকে মোড়কে তুলে নাম দেয়া হচ্ছে ডালডায় ভাজা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই। যেন ডালডা আর ঘিয়ে ভাজা ব্যতীত বাজারে আর কোনো লাচ্ছাই নেই। এখানে বৈধ অবৈধ প্রস্তুতকারক সকল কোম্পানিই “বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন এর (বিএসটিআই) মান চিহ্ন ব্যবহার করে ভেজাল খাওয়াচ্ছে। বেনামি থেকে সুনামধন্য সকলেই নাম লিখিয়েছেন এই ভেজালের তালিকায়।
শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকার টোলায় লাচ্ছা প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠান “আল মদিনা বেকারী। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অবৈধ ভাবে বিভিন্ন কোম্পানির মোড়কে লাচ্ছা সরবরাহ করছে যার প্রতিটি মোড়কেই রয়েছে বিএসটিআই এর মান চিহ্ন।
সরেজমিনে, এমন এক চুক্তিপত্র দেখাযায় শেরপুর পৌর শহরের বৈকাল বাজার এলাকায় আহম্মদ আলীর কাছে। তিনি রাতের অন্ধকারে আলমদিনা থেকে খাচিতে করে নিম্নমানের লাচ্ছা কিনে তা বিএসটিআই এর লোগো সম্বলিত “সাব্বির লাচ্ছা সেমাই নামক কোম্পানির মোড়কে প্যাকেটজাত করছিলেন। তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, স্ট্যাম্পে লেখাপড়া করে তিনি আলমদিনা থেকে লাচ্ছা কিনে প্যাকেটজাত করছেন এবং আলমদিনার বিএসটিআই এর অনুমোদন আছে তাই তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে বিএসটিআই এর লোগো ব্যবহার করা যাবে। এমন একাধিকজনের সাথে চুক্তিবদ্ধ আলমদিনা বেকারী।
এরপরে “আলমদিনা বেকারীর কারখানায় গেলে দেখা যায়, “জান্নাত ফুড প্রডাক্টস নামের কোম্পানির মোড়কে লাচ্ছা প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। একদম নোংরা পরিবেশে খালি হাতে, খালি গায়ে শ্রমিকরা কাজ করছে। শরীর থেকে ঘাম টপ টপ করে পরছে। মাছি ভর্তি পামওয়েলের ড্রাম মাটিতে পরে রয়েছে।
জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক খোরশেদ আলম বাবলু চাঁদনী বাজারকে জানান, ঢাকার অর্ডারের মাল ওইটা। তার একটি প্রডাক্টের বিএসটিআই অুনমোদন আছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সহ সকল কাগজপত্রই আছে। তিনি বলেন, যেকোনো একটি প্রডাক্টের বিএসটিআই অনুমোদন থাকলে আর বাদবাকি গুলোর না থাকলেও চলে। অথচ আইনানুসারে শুধু পণ্যের ভিন্নতায় নয় একটি কোম্পানির কোনো পণ্যের নামের একটি বর্ণ পরিবর্তন করতে চাইলেও লাগবে আলাদা অনুমোদন। এছাড়াও পামওয়েল সম্পর্কে বাবলু জানান, কোনো কারখানাই সয়াবিন দিয়ে লাচ্ছা ভাজে না, সয়বিনে ভেজে প্যাকেট করলে গন্ধ হয় তাই সবাই আমার মতো পামওয়েলই ব্যবহার করে। ঘিয়ের তৈরী লাচ্ছার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ওগুলা সব নামের ঘি। ঘি দিয়ে লাচ্ছা ভেজে বিক্রি করা সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ পামওয়েলে ভেজে ঘি স্প্রে করা সম্ভব তার পরেও ঘিয়ের সাথে ডালডা মিশিয়ে স্প্রে করা হয়। তিনি জানান, পামওয়েলে ভাজা সারে ১৮ কেজি ও ২০ কেজির প্রতি খাচি লাচ্ছা বিক্রি করছেন ১৯শ এবং ২ হাজার ৫০ টাকায়।
এছাড়াও বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই। কারিগররা জানান, প্রকৃতপক্ষে লাচ্ছা সেমাই ঘিয়ে ভেজে বাজারে বিক্রি করা সম্ভব নয়। পামওয়েলের সাথে সামান্য ঘি মিশিয়ে অথবা পামওয়েলে ভাজার পর ঘিয়ের আস্বাদন স্প্রে করা যেতে পারে।
এরপরে শেরপুর শহরের হাটখোলা রোডে “সাউদিয়া ডেইরী এন্ড ফুড প্রডাক্টস্ নামক লাচ্ছা প্রস্তুতকারক কারখানা থেকে চাক্ষুষ প্রমানিত হয় ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা তৈরীর ভেতরের রহস্য। অখ্যাতদের সাথে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান গুলোও একইভাবে প্রতারণা করছেন ক্রেতাদের সাথে। সেখানে পামওয়েলে লাচ্ছা ভেজে তাতে ঘিয়ের আস্বাদন স্প্রে করে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা নামে। লেমিনেটিং করা চকচকে মোড়কে তুলে বাজারজাত করা হচ্ছে ৫০০ থেকে ১২০০ টাকায় প্রতি কেজি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে “সাউদিয়া ডেইরী এন্ড ফুড প্রডাক্টস এর কারখানায় দায়িত্বরত “মুহিদ চাঁদনী বাজারকে জানান, এসব তথ্য সঠিক নয়। আমরা সম্পন্ন ঘিয়ে ভেজে লাচ্ছা সেমাই তেরী করি। তবে এমন কাজ যদি কেউ করে থাকে তাহলে আমাদের না জানিয়ে করেছে। আমরা এ বছর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা তৈরীই করিনাই। আর যারা এই কাজগুলো করত তাদেরকে কারখানা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে চলতি মাসের বিভিন্ন তারিখে তৈরীকৃত লাচ্ছা এখনও বাজারে বিক্রি হওয়ার ব্যপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এর পাশাপাশি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বৈকালী দই মিষ্টিঘর নামক প্রতিষ্ঠানের ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই। তবে তারা সম্পূর্ণ ঘিয়েই লাচ্ছা ভাজেন বলে দাবি করেন বৈকালী দই মিষ্টি ঘরের মালিক পার্থ সাহা। তবে এক কেজি লাচ্ছা ভাজতে কি পরিমাণ ঘি লাগতে পারে জানতে চাইলে পার্থ সাহা বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো ধারনা নেই, হিসেবের খাতা দেখে বলতে পারবেন।
শেরপুরের “নাহিদ এন্ড নাঈম ফুড প্রডাক্টেস’র মালিক মো: হেলাল উদ্দিন চাঁদনী বাজারকে বলেন, আমরা ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই বানাই না। কারণ লাচ্ছা ভাজার কড়াইয়ে একবারে এক ব্যারেল ঘি প্রয়োজন হয় যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় দুই লক্ষ টাকা। এত ব্যয়ে কিভাবে লাচ্ছা সেমাই তৈরী করা সম্ভব? তিনি বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে অবৈধদের ভিড়ে আমাদের বৈধভাবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মইনুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিত ভেজাল বিরোধী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগে কয়েকদিন আগে গাড়িদহের এক কারখানার দুই জনকে কারাদন্ড ও অর্থদন্ড দেয়া হয়েছে। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
দৈনিক চাঁদনী বাজার / সাজ্জাদ হোসাইন
