ইট ভাটার বিষাক্ত গ্যাসে পুড়ল গাইবান্ধা জেলার ফল ও ফসল
চলতি বছর সারাদেশে ইট ভাটার মওসুম সম্প্রতি শেষ হয়েছে। দেশে বিরাজমান আবহাওয়া এবার ইট-ভাটার অনুকূলে থাকলেও কয়লার দাম বেশি হওয়ায় ইটের দাম বেশ চড়া। অবশ্য এতে খুশি ভাটা মালিককরা। একটু বেশি খুশি জেলাওয়ারী ভাটাগুলোতে তেমন কোনো প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না থাকায়। অপরদিকে ইট ক্রেতারা দাম বেশি হওয়ায় কিছুটা নাখোশ হলেও এবছর ইট-ভাটার বিষাক্ত গ্যাসে ভাগ্য পুড়েছে কৃষকের। চলতি বোরো মওসুমে দেশের প্রতিটি ভাটা এলাকায় উত্তপ্ত ও বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে মিশে ধানের বেশ ক্ষতি করেছে। পাশাপাশি ভাটা এলাকার আম, কাঁঠাল, নারিকেল সহ বৃক্ষরাজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পরিমাণ হিসেবে যা নির্দিষ্ট করা বেশ কষ্টসাধ্য। এমন অবস্থায় গাইবান্ধা জেলার কৃষকের কপাল পোড়ার পাশাপাশি পুড়েছে জেলার ফল ও ফসল।
গাইবান্ধা জেলাজুড়ে এবার প্রায় দেড় শতাধিক ইট ভাটা চালু ছিল। বৈধ-অবৈধতার প্রশ্নে নগন্য ছিল বৈধ ভাটার সংখ্যা। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় বেশ সচেতন। যার ফলে জেলায় বৈধ ভাটার সংখ্যা দুই হাতের ১০ আঙ্গুলের দ্বিগুণও হয়তবা নয়। তারা যেমন প্রকৃতি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে ইট ভাটার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো জানেন; তেমনি ভাটা মালিকরাও জানেন। তবুও শতাধিক অবৈধ ইট-ভাটা এবারের মওসুম সফলতার সাথে মওসুম সম্পন্ন করেছে। উভয়ের জাগ্রত বিবেককে নতুন করে জাগাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ক্ষতির সামান্য নজির তুলে ধরছি। তবুও যদি আড়মোড়া দিয়ে জেগে ওঠে; বন্ধ করে দেয় অবৈধ সব ভাটা-তবে সার্থক হবে এ আঘাত।
জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের মহদীপুর গ্রামে ইট ভাটার উত্তপ্ত ও বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শতাধিক কৃষকের সোনালী স্বপ্ন পুড়ে নষ্ট হয়েছে। এ উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ইট ভাটাটি আজও বন্ধ হয়নি। যুগব্যাপী ভাটা ব্যবসায় সফলতার দাবিদার তারা। এ উপজেলায় এম.এম.বি ইটভাটার আগুনের তাপে পুড়েছে প্রায় ৭০ বিঘা জমির ধান। গত ২৪ এপ্রিল বিকেলে ভাটা মালিক গোকুল চন্দ্র তার ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেওয়ায় ভাটার উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বে প্রায় ৭০/৮০ বিঘা জমির ইরি বোরো ধান পুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অত্র এলাকার পানের বরজ, আম, কাঁঠাল, নারিকেল সহ বিভিন্ন ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এ ঘটনায় ভাটা মালিক গোকুল চন্দ্র কৃষকদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা করছেন বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। এমন অবস্থা সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্যাপুর উপজেলাতেও। সবই চলছে ম্যানেজ প্রক্রিয়ায়।
এদিকে সাঘাটায় অনুমোদনবিহীন মেসার্স বিএমকে-২ ব্রিকস ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ৫০ বিঘা জমির বোরো ধান পুড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে। অনুমোদন ছাড়া ইটভাটাটি চলছে গত ৭ বছর থেকে। উপজেলার টেপাপদুমশহর গ্রাামের কৃষক ও কৃষি শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম। কষ্টের সংসারে ধারদেনা করে দুই বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। অনেক স্বপ্ন এই দিয়েই ফিরবে সংসারে সুদিন। কিন্তু সেই ধান পুড়ে গেছে ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে। ধান পাকার আগেই পাতা ও শীষ পুড়ে তার দুই বিঘা জমির সব ধানগাছ বিবর্ণ রঙ ধারণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, এখন আমরা কী খাবো? কে দেখবে আমাদের কষ্ট। ৭ বছরে এই ইটভাটার কারণে আমরা ধানচাষে ব্যাপক ক্ষতিতে পড়েছি। এ বছর এই গ্রামে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বিঘা জমির ধান পুড়ে গেছে।
সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাদেকুজ্জামান বলেন, আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কী পরিমাণ জমির ক্ষতি হয়েছে তার জরিপ চলছে। বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলেছি। ওই উপজেলায় কোনো ইটভাটার অনুমোদন নেই। ওই ইটভাটাটি বন্ধের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইটভাটাটি বন্ধের সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উপজেলার ৩৮ জন কৃষককে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ইট-ভাটা কর্তৃপক্ষ।
অপরদিকে ইটভাটা সংখ্যার দিক থেকে জেলার অন্যতম গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এবার পরিবেশ প্রকৃতি ও জনস্বাস্থের সবচাইতে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫টি ইট ভাটার গ্যাস বের করে দিয়ে মওসুম শেষ করা হয়েছে। উপজেলার কামারদহ, কোচাশহর, শিবপুর, মহিমাগঞ্জ, নাকাই, রাখালবুরুজ, তালুককানুপুর, দরবস্ত, কাটাবাড়ী, সাপমারা ও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার মধ্যে অবস্থিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব ইউনিয়নে বোরো ধানের পাশাপাশি আম, কাঁঠাল, নারিকেল সহ সব ধরণের ফলের বিগত সময়ের উৎপাদনের এক চতুর্থাংশ অর্জন সম্ভব হবে না।
বিষয়টিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজা-ই-মাহমুদ জানান, ইট ভাটা জনিত কোথাও যদি ক্ষতি হয় আমরা তা পরিদর্শন করছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি; আমাদের বরাবরে অভিযোগগুলো পাওয়ার পরে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
একটি লেখায় জেলার সকল ক্ষতি ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যগুলো তুলে ধরা সম্ভব নয়। ইট-পাথরের যুগে ইট-ভাটা বন্ধ থাকবে তা হয় না। পক্ষান্তরে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতির শীর্ষ তালিকায় থাকা আমাদের সোনার বাংলাকে ধ্বংস করে, অবৈধ ইট ভাটাগুলো যুগের পর যুগ চলতে থাকে কীভাবে! আমরা সবাই স্ব-স্ব অবস্থানে সদা জাগ্রত; তবুও জাগ্রত করি বিবেককে। আমাদের কৃষকের ফসল পুড়ছে, গাছ ও ফল নষ্ট হচ্ছে, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আমরা ও আগামী প্রজন্ম। সব বিবেচনায় জেলায় সব ইট ভাটা আগামী মওসুমে পাক বৈধতা; নয়ত অবৈধ সব ইট ভাটা ধ্বংস করে দেওয়া হোক এমনটাই কামনা সচেতন মহলের। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না।
দৈনিক চাঁদনী বাজার / সাজ্জাদ হোসাইন
