নওগাঁয় ইফতারের ফলের বাজারে আগুন, খালি হাতে ফিরছেন হতদরিদ্ররা
পবিত্র রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের টেবিলে ফল যেন অনিবার্য উপাদান। পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ক্লান্তি দূর করতে ফলের চাহিদা এ সময় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এবার সেই চাহিদাকেই পুঁজি করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে উত্তরের জেলা নওগাঁর ফলের বাজারে। গত তিন দিনের ব্যবধানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। চরম চাপে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও। অনেক হতদরিদ্র ক্রেতা ইফতারের ফল কিনতে এসে খালি হাতেই ফিরছেন।
শহরের গোস্তহাটির মোড়, ব্রীজ মোড় ও সোনাপট্টি এলাকার বিভিন্ন ফলের দোকান ঘুরে দেখা যায়, রমজান শুরু হওয়ার পরপরই প্রায় সব ধরনের ফলের দাম বেড়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি পেঁপে ৮০ টাকা, তরমুজ ৯০ টাকা, পেয়ারা ১০০ টাকা এবং আনারস ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি ফলের মধ্যে স্ট্রবেরি ৬০০ টাকা, মাল্টা ৩৪০ টাকা, কমলা ৩০০ টাকা থেকে ৩৪০ টাকা, আপেল ৩০০ টাকা থেকে ৪৪০ টাকা এবং আঙ্গুর ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুরের দাম মান ও ধরনভেদে ২৩০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি হালি (৪টি) কলা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকায়। প্রতি পিস আঠা বেল ৪০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
রোজা শুরুর এক দিন আগে বাজারে যে দামে ফল বিক্রি হয়েছে তার সঙ্গে বর্তমান দামের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। তখন প্রতি কেজি পেঁপে ছিল ৬০ টাকা, তরমুজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পেয়ারা ১৪০ টাকা, আনারস ৬০ টাকা। স্ট্রবেরি ছিল ৭০০ টাকা, মাল্টা ২৮০ টাকা, কমলা ২৮০ টাকা থেকে ৩২০ টাকা, আপেল ২৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকা এবং আঙ্গুর ৩৮০ টাকা। খেজুরের দাম ছিল ১৬০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। কলা প্রতি হালি ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং আঠা বেল ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
অর্থাৎ কয়েকটি ফলের ক্ষেত্রে সামান্য ওঠানামা থাকলেও অধিকাংশ ফলেই ১০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বিশেষ করে তরমুজ, পেঁপে ও মাল্টার দাম বৃদ্ধিতে বেশি ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। রমজানে ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দোকানে এসেও ফল না কিনেই ফেরত যাচ্ছেন অনেক হতদরিদ্ররা। দু’একটি দোকান ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী মূল্য তালিকা লিখে রাখলেও অনেকেই সেই তালিকা ফাঁকা রেখে ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন।
শহরের আরজী নওগাঁ মধ্যপাড়া এলাকার রিকশাচালক মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, ‘‘রোজা রেখে ইফতারে পরিবারকে নিয়ে একটু ফল খাওয়ার ইচ্ছে ছিলো। তবে ইচ্ছে থাকলেও আমাদের উপায় নেই। এখনকার দাম অনুযায়ী ফল কিনে খাওয়া আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনিতেই রমজানে স্কুল ছুটি থাকায় দৈনিক আয় অন্তত ৩০০ টাকা কমেছে। তাই ফলের দাম শুনেই ফিরে যেতে হচ্ছে’’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী বলেন, “রমজানের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেশি। তার ওপর ফলের দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইফতারে ফল না রাখলে মন সায় দেয় না। কিন্তু বাজেটও তো মানতে হবে। নানান অযুহাতে ব্যবসায়ীরা ফলের দাম বাড়াচ্ছেন। তরমুজ খাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় দুই হালি কলা কিনেই ফেরত যেতে হচ্ছে”।
বাজারে ফলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বর্ণপট্টি এলাকার আশা ফল ভান্ডারের বিক্রেতা শাহজাহান আলী বলেন, “রমজান উপলক্ষে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবও রয়েছে। আমরা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছি। তাই খুচরা বাজারেও দাম কিছুটা বাড়াতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা এখন মাল্টার। এখানে বাজার সিন্ডিকেট নেই বলে দাবী করেন তিনি”।
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাদিয়া আফরিন বলেন, “রমজান এলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়াটা এদেশের ট্রেন্ড। সেই ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনী দ্রব্যসহ ফলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভোক্তা অধিকারের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা শীঘ্রই অভিযানে নামবে। কেউ সিন্ডিকেট করে ফলের দাম বাড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্যা নেওয়া হবে”।
