প্রকাশিত : ২ মার্চ, ২০২৬ ০০:৫১

রাণীনগরে হাজার হাজার কৃষকের চির দুঃখ ‘রক্তদহ বিল’

বিলটি পুনঃখনন না করায় প্রতিবছর কৃষকদের ১৭০ কোটি টাকার ক্ষতি, জলাবদ্ধতায় ৭ হাজার কৃষকের স্বপ্ন অধরা
রাণীনগর, নওগাঁ সংবাদদাতা:
রাণীনগরে হাজার হাজার কৃষকের চির দুঃখ ‘রক্তদহ বিল’

ঐতিহ্যবাহী ‘রক্তদহ বিল’। যার অবস্থান নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সীমানার মধ্যে। বিলের সিংহভাগই রাণীনগর উপজেলার অংশে। ২২০ হেক্টর আয়তনের জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে রক্তদহ বিল। এই বিলে ইনলেট খালের সংখ্যা ২২টি, যার দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার। আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২কিলোমিটার। বিলের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মাত্র এক ফসল উৎপাদন হয়। যার ফলে বছরের পর বছর ২৩টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে রক্তদহ বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে কৃষকরা প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন করা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। তাই দ্রুত রক্তদহ বিলটি পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন এলাকার কৃষকেরা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, রক্তদহ বিলের আশেপাশে রয়েছে ২৩টি গ্রাম। যে গ্রামগুলোর মানুষরা বছরের পর বছর এই বিলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে বর্তমানে বছরের অধিকাংশ সময়ই জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকছে। যার ফলে কমেছে ফসলের উৎপাদন। কমেছে প্রাকৃতিক উপায়ে বড় হওয়া মাছের আধিক্য।

জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বিলের জমিতে বছরে মাত্র একটি ইরি-বোরো ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যদি বিলটি পুনঃখনন করা হয় তাহলে শত বছরের ঐতিহ্য রক্তদহ বিল থেকে প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের আশা করছে বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে বিলটি পুনঃখননে বিলে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে, তেমনিভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরবে আমূল পরিবর্তন। তাই জীবিকার মান উন্নয়নে, স্থানীয় অর্থনৈতিক চাকাকে আরও গতিশীল করতে এবং আগামীর টেকসই ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনির্মাণে ঐতিহ্যবাহী রক্তদহ বিলকে পুনঃখননের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।

জানা যায়, রাণীনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের উপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’ এবং মৎস্য অভয়াশ্রম। সেই পর্যটন এলাকায় এসে প্রতিদিনই শত শত পর্যটকরা প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে পাখি পল্লীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাখি পল্লীর সঙ্গে রক্তদহ বিলের জলকেলি উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটছে। রক্তদহ বিলটি পুনঃখনন করা যায় তাহলে অত্র অঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। রক্তদহ বিলকে ঘিরে পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানালেন, রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’র সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যার অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজও চলমান রয়েছে।

বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলা (আংশিক) ও আদমদীঘি উপজেলা (আংশিক) অংশের ২২০ হেক্টর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে রক্তদহ বিল। বিলে ইনলেট খালের সংখ্যা ২২টি যার দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২কিলোমিটার। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মাত্র এক ফসল উৎপাদন হয়। যার ফলে বছরের পর বছর ২৩টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন করা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে স্থানীয় কৃষকরা।

উপজেলার বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান, মুকুল হোসেনসহ স্থানীয় অনেকেই জানান, রক্তদহ বিল হচ্ছে দু’টি উপজেলার সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত এই সম্পদের রক্ষনাবেক্ষণ না করার কারণে সরকার এই সম্পদ থেকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। যদি বিলটি পুনঃখনন করা হয়, তাহলে বিলের জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এছাড়া ফসলের পাশাপাশি মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিলের চারপাশের হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবনচিত্র পাল্টে যাবে। পাল্টে যাবে এই অঞ্চলের দৃশ্যপট। তাই দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে রক্তদহ বিলটি পুনঃখননের কোন বিকল্প নেই।

নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বিল পুনঃখননের সুফল সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে বিল এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল উৎপন্ন হচ্ছে। বিল ও এর আশেপাশের খাল পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন করা সম্ভব। খননে প্রতি হেক্টরে ১২ মেট্রিকটন হিসাবে বছরে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার মেট্রিকটন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। খননকৃত বিল ও খালের মাটি দ্বারা ১০ফুট চওড়া পাকা গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হবে এবং খাল ও বিলের পাড়ে নির্মিত রাস্তার ভাঙ্গন রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় রিটেইনিং ওয়াল, কংক্রিট ব্লক দ্বারা বাঁধাই, প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা সম্ভব হবে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। পুনঃখননের প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করা গেলে এলাকায় বিশাল জলাধারের সৃষ্টি হবে। যার ফলে প্রচুর মৎস্য উৎপাদন ও হাঁস পালন হবে যা দেশের মাছ, মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণসহ স্থানীয় জনগনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পরিবেশের উন্নতির জন্য নির্মিত গ্রামীণ সড়ক, খাল ও বিলের পাড়ে ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছ রোপন করা সম্ভব। বড় জলাধার ও বৃক্ষরোপনের কারণে পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বিল পুনঃখননের পর বিলের চারিদিকে বিভিন্ন প্রকারের পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপন করাসহ শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন স্থানে দোলনা, স্লিপার, ব্যালেন্সার ইত্যাদি স্থাপন করা হলে এলাকাটি স্থানীয় জনসাধারণের জন্য একটি বিশুদ্ধ ও সুস্থ বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। যদি বিলটি পুনঃখনন ও এতে সংরক্ষিত ভ’-পরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারের ফলে ভ’-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার যেমন হ্রাস পাবে তেমনি ভাবে ভ’-গর্ভস্থ পানির স্তরও বৃদ্ধি পাবে। দেশের এমন জাতীয় সম্পদকে সঠিক ও টেকসই ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে রক্তদহ বিল পুনঃখননের জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

উপরে