এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে হাতিয়ার ৮০ গ্রাম, চরম দুর্ভোগে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ
টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের প্রভাব এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ৮০টিরও বেশি গ্রাম এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি জমে থাকায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি মানুষদের অনেকেই রান্না করতে পারছেন না, দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতিয়া পৌরসভা, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, হরণী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের নিচু এলাকা। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কাঁচা-পাকা সড়ক ও বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টানা বৃষ্টি পরিস্থিতিকে জটিল করলেও দীর্ঘদিন ধরে খাল-নালা সংস্কার না হওয়া এবং সরকারি খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠাই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। একসময় যেসব খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত মেঘনা নদীতে নেমে যেত, সেগুলোর অনেকগুলো এখন ভরাট, দখল বা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় আটকে থেকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।
হাতিয়া পৌরসভার ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “উপজেলা সদরের মার্টিন খালের ওপর দীর্ঘদিন ধরে দোকানঘর ও মার্কেট নির্মাণ হওয়ায় খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে ভারী বৃষ্টি হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত। এখন কয়েকদিন ধরে পানি জমে থাকে। এতে পৌরসভার অন্তত ছয়টি ওয়ার্ডে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে, মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খাল পুনঃখনন করা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
পৌরসভার বাসিন্দা সেলিনা আক্তার বলেন, “ছয় দিন ধরে আমরা পানিবন্দি। ঘরের ভেতর, উঠান ও রান্নাঘর—সব জায়গায় পানি। চুলা ডুবে থাকায় নিয়মিত রান্না করা যাচ্ছে না। ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি হলেই প্রতি বছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না।”
দিনমজুর আবুল কালাম বলেন, “আমি প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাই। কয়েক দিন ধরে পানি থাকায় কোথাও কাজে যেতে পারছি না। আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরে যে সামান্য খাবার ছিল, তাও প্রায় শেষ। সরকারি সহায়তা কিছু পেয়েছি, তবে এই পরিস্থিতি যদি আরও কয়েক দিন থাকে, তাহলে পরিবার নিয়ে বড় সংকটে পড়তে হবে।”
কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, “আমনের বীজতলা, সবজি ক্ষেত ও পুকুরের চারপাশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। প্রতিবছর একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কৃষকদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও খালগুলো পুনঃখনন করা প্রয়োজন।”
মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এএম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ.ন.ম. হাসান বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও প্রবেশপথ পানির নিচে। শুধু ত্রাণ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। পানি চলাচলের সব খাল দখলমুক্ত করতে হবে, নিয়মিত খনন করতে হবে এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে মানুষকে এমন দুর্ভোগে পড়তে হবে না।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রতিবছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। বর্ষা শুরুর আগেই খাল খনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পানি চলাচলের পথ দখলমুক্ত করা হলে এ ধরনের দুর্ভোগ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় নিরাপদ পানি সংগ্রহে ভোগান্তি বাড়ছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে জ্বর, ডায়রিয়া ও চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার ও সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে। সরকারি খালের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
