প্রকাশিত : ১৯ জুলাই, ২০২৬ ০১:৩৩

পাবনায় বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, শালিশে ২০ জুতার বাড়ি, পাল্টা মামলায় ঘটনার নতুন মোড়

পাবনা সংবাদদাতাঃ
পাবনায় বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, শালিশে ২০ জুতার বাড়ি, পাল্টা মামলায় ঘটনার নতুন মোড়

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার হাঁড়িয়াকাহন ভাঙ্গাপাড়া গ্রামে এক বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রাম্য শালিশে অভিযুক্তকে ২০টি জুতার বারি মারার সিদ্ধান্ত ও জুতা পেটা কাযর্কর এবং সেই ঘটনায় আইন নিজ হাতে তুলে নিয়ে জুতা পেটাকারীদের শালিশী প্রধানদের নামে মামলা দায়ের হয়েছে। পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, গত ৬ জুলাই দুপুরে উপজেলার গৌরিগ্রাম ইউনিয়নের হাঁড়িয়াকাহন ভাঙ্গাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে একই গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে মহব্বত আলীকে।

ভিকটিমের ভাই এরশাদ আলী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪) ধারায় সাঁথিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নম্বর-১৬, তারিখ ১৩ জুলাই ২০২৬।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন দুপুরে মহব্বত আলী কাঁঠাল কাটার জন্য ভিকটিমের মায়ের কাছ থেকে একটি কাচি নিয়ে যান। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা সাময়িকভাবে বাড়ির বাইরে গেলে বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রতনা খাতুন বাড়িতে একা ছিলেন। এ সুযোগে মহব্বত আলী ঘরে প্রবেশ করে তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে পরনের পায়জামা খুলে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভিকটিম চিৎকার করলে অভিযুক্ত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

ভিকটিমের পরিবার জানায়, ঘটনার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১২ জুলাই সন্ধ্যায় স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মালেকের বাড়িতে একটি শালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্থানীয় চেয়ারম্যান ওয়াহাব মাস্টার, আলহাজ মণ্ডল, খোরশেদ ডাক্তার, বাবু মোল্লা, আবু সাঈদসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অভিযুক্তকে ২০টি জুতার আঘাত করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়।

পরে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করার ঘটনাটি নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়।

এরপর ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ভিকটিমের ভাই থানায় মামলা দায়ের করেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত মহব্বত আলীর স্ত্রী রোজিনা খাতুন তার স্বামীকে জনসম্মুখে জুতাপেটা ও অপদস্থ করার অভিযোগ এনে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নম্বর-১৭, তারিখ ১৩ জুলাই ২০২৬।

ওই মামলায় গৌরিগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়াহাব মাস্টার, সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক, মহরম আলী, খোরশেদ ডাক্তার, আলহাজ মণ্ডল, আবু সাঈদ, ইউপি সদস্য আরশেদ আলী, এরশাদ আলী, এনামুল, ইমদাদুলসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্তকে জনসম্মুখে জুতাপেটা করা হয়। এছাড়া স্থানীয় চৌকিদার সুজন ও রফিক ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ভিকটিমের পরিবারের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ তাদের মামলা করতে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, অভিযুক্তের স্ত্রীকেও শালিশকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাঁথিয়া থানার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, উভয় পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে পৃথক দুটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একদিকে একজন বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, অন্যদিকে আদালতের পরিবর্তে গ্রাম্য শালিশের মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর—দুই ঘটনাই এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই প্রচলিত আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত এবং একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরে