প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬ ২৩:১১

এক রাতেই মক্কা থেকে আরশে মুআল্লা: আজ শবই মেরাজের পবিত্র রজনী

নীরব সিফাতঃ
এক রাতেই মক্কা থেকে আরশে মুআল্লা: আজ শবই মেরাজের পবিত্র রজনী
পবিত্র শবে মেরাজের গ্রফীতি। ছবি: AI Generated

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর ঘটনা হলো ইসরা ও মেরাজ। নবুয়ত লাভের পর থেকেই তিনি ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কুরাইশদের অব্যাহত নির্যাতন, অপমান ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হন। সে কঠিন সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সান্ত্বনা ও শক্তির প্রধান অবলম্বন ছিলেন তাঁর পুণ্যবতী সহধর্মিণী হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) এবং স্নেহশীল অভিভাবক চাচা আবু তালিব।

অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথমে চাচা আবু তালিব এবং পরে হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ইন্তেকাল করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর শোক ও বেদনায় নিমজ্জিত হন। তিনি এই বছরকে ‘আমুল হুজন’, অর্থাৎ দুঃখের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মানবিক সহানুভূতি ও দাওয়াতের আশায় তিনি তায়েফ গমন করেন; কিন্তু সেখান থেকেও তাঁকে ফিরে আসতে হয় রক্তাক্ত শরীর ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে।

এই চরম দুঃখ ও একাকিত্বের মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনা ও সম্মান দিতে আয়োজন করেন এক অতুলনীয় সফরের—ইসরা ও মেরাজ

বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা শরিফের হাতিমে বিশ্রামরত ছিলেন। তখন কয়েকজন ফেরেশতা এসে তাঁর পবিত্র বক্ষ বিদীর্ণ করেন, হৃৎপিণ্ড বের করে তা ঈমান ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে পুনরায় স্থাপন করেন। এরপর তাঁকে ‘বোরাক’ নামক বাহনে আরোহণ করিয়ে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসুলগণের ইমাম হয়ে সালাত আদায় করেন।

এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বাকাশের মহিমান্বিত সফর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে একে সাত আসমানে গমন করেন এবং প্রত্যেক আসমানে অবস্থানরত নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সালাম বিনিময় করেন।
প্রথম আসমানে হজরত আদম (আ.),
দ্বিতীয় আসমানে হজরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.),
তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.),
চতুর্থ আসমানে হজরত ইদ্রিস (আ.),
পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.),
ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.),
এবং সপ্তম আসমানে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এরপর তিনি গমন করেন বায়তুল মামুরে—যেখানে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় হাজার হাজার ফেরেশতা ইবাদতের জন্য প্রবেশ করেন এবং একবার বের হলে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ পান না। সেখান থেকে তিনি পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহায়, যা সৃষ্টিজগতের শেষ সীমানা। এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর প্রকৃত রূপে প্রত্যক্ষ করেন, যার ছিল ছয়শত পাখা।

এই সিদরাতুল মুনতাহাতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভ করেন। এই মহিমান্বিত সফরেই উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। তিনি জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত ও জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব প্রত্যক্ষ করেন। জান্নাত সম্পর্কে তিনি বলেন, জান্নাতের প্রাসাদসমূহ মুক্তার তৈরি এবং তার মাটি মেশকের সুবাসে ভরপুর (বুখারি শরিফ)।

মেরাজের রাতে তিনি এমন কিছু লোককেও দেখেন, যাদের তামার নখ ছিল এবং তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও শরীরে আঁচড় কাটছিল। জিবরাইল (আ.) জানান, এরা হলো সেইসব লোক যারা দুনিয়াতে মানুষের গিবত করত ও সম্মানে আঘাত হানত (মুসনাদে আহমাদ)।

ঊর্ধ্বাকাশের সফর শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন। পবিত্র কোরআনে এই মহান ঘটনার কথা আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফর করিয়েছেন—যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি—যাতে আমি তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি।”
—সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১

পবিত্র শবই মেরাজের এই রাত নবীপ্রেমিক উম্মতের জন্য এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রজনী। এ রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নামাজের গুরুত্ব, ধৈর্যের শিক্ষা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার অপরিহার্যতা।

সংকলন ও সম্পাদনাঃ  নীরব সিফাত, সাব-ইডিটর, দৈনিক চাঁদনী বাজার ডিজিটাল ডেস্ক

উপরে