রঘু রাই : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার এক অনন্য দলিল
ভারতীয় আলোকচিত্র জগতের কিংবদন্তি রঘু রাই আর নেই| রোববার (২৬ এপ্রিল) দিল্লিতে ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন| দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময়জুড়ে তার ক্যামেরা শুধু ছবি তুলেনি, বরং সময়, ইতিহাস ও মানুষের যন্ত্রণাকে নথিবদ্ধ করেছে|
১৯৪২ সালে অবিভক্ত ভারতের ঝাং (বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত) অঞ্চলে জন্ম নেওয়া রঘু রাই শুরুতে ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার| তবে পেশাগত সেই পথ ছেড়ে তিনি ক্যামেরাকেই বেছে নেন জীবনের মূল ধারা হিসেবে| মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় তার ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে তাকে বিশ্বখ্যাত ফটোসাংবাদিকে পরিণত করে|
১৯৬৫ সালে তিনি পেশাদার ফটোগ্রাফি শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন| পরবর্তীকআলে তিনি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক ফটো এজেন্সি ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এর সঙ্গে যুক্ত হন|
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রঘু রাই শরণার্থী শিবির, সীমান্ত এলাকা এবং যুদ্ধের মানবিক বাস্তবতা ক্যামেরায় ধারণ করেন| তার তোলা শরণার্থীদের দুর্দশা, অনাহার, ক্লান্তি ও সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষের ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং বাংলাদেশের ¯^াধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল হয়ে ওঠে|
তার কাজের ¯^ীকৃতি¯^রূপ ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেন| এরপরও তিনি বিশ্বব্যাপী নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আলোকচিত্র ধারণ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন|
রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম| ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা, মাদার তেরেসা থেকে শুরু করে ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস— সবই তার ফ্রেমে ধরা পড়েছে|
তিনি বহু বই প্রকাশ করেছেন এবং বিশ্বের নামকরা ম্যাগাজিনে তার ফটোস্টোরি প্রকাশিত হয়েছে| মানবিক সংকট, যুদ্ধ, দুর্যোগ ও সামাজিক বাস্তবতাকে তিনি আলোকচিত্রের মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা তাকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে|
রঘু রাইয়ের মৃত্যুতে বিশ্ব ফটোগ্রাফি জগতে এক যুগের অবসান হলো| তবে তার তোলা ছবিগুলোই রয়ে যাবে ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে|
