প্রকাশিত : ৬ জুলাই, ২০২৬ ০১:২৩
চলনবিলে বন্যার পানি আসায় নৌকা তৈরির ধুম
বর্ষাকালে বন্যার পানি আসায় নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত চলনবিলের কারিগররা
আশরাফুল ইসলাম সুমন, সিংড়া, নাটোর
চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি আসতে শুরু করেছে। দিন দিন বাড়ছে পানি। বর্ষা ঋতুর আগমনে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কারিগররা। দিনরাত এক করে নৌকা তৈরি করছেন তারা। নতুন নৌকার পাশাপাশি অনেকে আবার পুরনো নৌকা মেরামতের জন্য ছুটছেন তাদের কাছে। সিংড়া উপজেলায় বর্ষাকালে চলনবিল ও আত্রাই নদীতে জেলেরা মাছ শিকার করে থাকেন। তাই এ সময় ব্যাপকভাবে নৌকার প্রয়োজন দেখা দেয়।
বছরের আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে কার্তিক পর্যন্ত ৫ মাস বন্যাকবলিত এই অঞ্চলের বেশিরভাগ গ্রাম ও পথঘাট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এসময় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত, হাটবাজার ও মাছ ধরার কাজে একমাত্র বাহন হয় নৌকা। তাই বর্ষাকালে বেড়ে যায় নৌকার কদর।
যারা জেলে পেশায় রয়েছেন, তারা এখনই মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ কারণে চলনবিল অঞ্চলে নৌকা তৈরির ধুম পড়েছে। আর নদীর আশপাশের এলাকার কেউ কেউ পুরনো নৌকায় লাগাচ্ছেন আলকাতরা, আবার কেউ বা দিচ্ছেন জোড়াতালি। কেউ কেউ তারকাঁটা ও লোহার পাত দিয়ে তক্তা জোড়া লাগানোর কাজে ব্যস্ত।
সরেজমিনে উপজেলার বিলদহর, কালিনগর, শেরকোল, তাজপুর, সাঁতপুকুরিয়া, বড়িয়া, ডাহিয়া ও বিয়াশ ও পৌর এলাকা ঘুরে দেখা যায় নৌকা তৈরির কারিগররা নতুন নৌকা তৈরি ও পুরনো নৌকা মেরামত কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কারিগররা বলছেন, নৌকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
পৌর শহরের বালুয়া বাসুয়া এলাকায় পুরনো নৌকা মেরামতের কাজ করছেন এক কাঠমিস্ত্রী। তিনি জানান, সারা বছর কাঠের কাজ করেন। বর্ষার এই সময়ে নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। এতে তার বাড়তি কিছু আয় হয়।
পৌরসভার চকসিংড়া মহল্লার নৌকা তৈরির কারখানার মালিক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমার কারখানায় কড়ই, হিজল ও মেহগনির কাঠ দিয়ে বেশিরভাগ নৌকা তৈরি হয়। এছাড়া আলকাতরা, বাঁশ, তারকাঁটাসহ বিভিন্ন উপকরণ লাগে। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০টি নতুন নৌকা বিক্রি করেছি। বেশিরভাগ ছোট ডিঙি নৌকা, যার অধিকাংশই মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ বছর ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রি হবে বলে আশা করছি। কাঠের নৌকা বিক্রি করছি ৫৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা ও প্লেন সিটের নৌকা বিক্রি করছি ৮৫০০ থেকে ৯০০০ টাকা দরে।
নৌকা তৈরির কারিগর স্বপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, বর্ষাকালে দিনে ২টি থেকে ৩টি নৌকা তৈরি করে থাকি। নৌকাভেদে মজুরি পাই ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকা করে। এছাড়া সারাবছর কাঠমিস্ত্রী হিসেবে কাঠের অন্যান্য জিনিসপত্র তৈরি করি। যা আয় হয় তা দিয়ে আমার সংসার চলে।
নৌকা কিনতে আসা সাঁতপুকুরিয়া গ্রামের মো. রুবেল হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামটি চলনবিলের মাঝখানে। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। বর্ষার সময় একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। তাই নৌকা কিনতে এসেছি। তবে এ বছর নৌকার দাম অনেক বেশি।
উপজেলার চামারী ইউনিয়নের আনন্দনগর এলাকা থেকে নৌকা কিনতে আসা আফজাল হোসেন বলেন, 'চলনবিলে পানি বাড়লেই নৌকার প্রয়োজন হয়। মাছ ধরা, জমিতে যাওয়া এবং এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাতায়াতের জন্য নৌকা ছাড়া উপায় নেই। তাই নতুন নৌকা কিনতে এসেছি'।
চলনবিলের নৌকা তৈরির কারখানার মালিক গোদা কুমার জানান, কাঠ, লোহাসহ অন্যান্য সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের চেয়ে খরচ অনেক বেশি লাগছে।
নৌকা তৈরির কারিগর আব্দুল কুদ্দুস বলেন, 'সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও বর্ষা এলেই আমাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। এখন প্রতিদিনই নতুন নৌকার অর্ডার পাচ্ছি। কাঠের দাম বেড়েছে, তারপরও মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে নৌকা বানাচ্ছেন। কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে'।
