প্রকাশিত : ১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:১৩
পাঠকের কলাম

উত্তরে তিস্তা, পূর্বে সুরমা, দক্ষিণে সাঙ্গু: তিন দিক থেকে ঘিরে আসা ২০২৬-এর বন্যা ও আমাদের করণীয়

মোছা: মাকছুদা খাতুনঃ
উত্তরে তিস্তা, পূর্বে সুরমা, দক্ষিণে সাঙ্গু: তিন দিক থেকে ঘিরে আসা ২০২৬-এর বন্যা ও আমাদের করণীয়
ছবি- AI Generated

তিন দিনে ৩২ জনের প্রাণহানি, ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি, ৬টি নদী ১০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে বিপদসীমার ওপরে, ১৭ জেলায় বন্যার সতর্কতা, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পাঁচ দিন ধরে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং চট্টগ্রাম-কঙ্বাজার রেলপথ স্থগিত  এটি জুলাই ২০২৬-এর বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির প্রথম সপ্তাহের চিত্র। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে আগামী ৪৮-৭২ ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। কিন্তু এবারের বন্যা শুধু একটি অঞ্চলের নয় - উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব একযোগে সংকটে, যা এই মৌসুমকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তুলেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অঞ্চল। বান্দরবানে সাঙ্গু নদী বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপরে (১৫.৩৬ সগঝখ, বিপদসীমা ১৪.৮০), মাতামুহুরী লামায় ৮৪ সেন্টিমিটার ওপরে এবং দোহাজারীতে সাঙ্গু ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। বাক্কালি নদীও ফুলে উঠেছে। গত কয়েক দিনে বান্দরবানে ভূমিধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সাতটি উপজেলায় ৩০ হাজার পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা প্রশাসন ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিয়েছে যেখানে ২,১৭৩ জন আশ্রয় নিয়েছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ দুই দিন বন্ধ থাকার পর আংশিকভাবে চালু হয়েছে, তবে রাঙ্গামাটির সাথে সড়ক যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। কঙ্বাজারে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া, কুতুবদিয়া বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথ স্থগিত এবং দ্বীপে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম-কঙ্বাজার রেলপথে সুন্নিয়া মাদ্রাসার কাছে ট্র্যাক পানিতে ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংসদে জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কঙ্বাজারে ভূমিধস ও বৃষ্টিজনিত ঘটনায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সিলেট বিভাগে সুরমা-কুশিয়ারা নদী দ্রুত বাড়ছে এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জে সতর্কতা স্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আটকা পড়েছে। খোয়াই, মনু, ধলাই, কংশ, জাদুকাটা ও সোমেশ্বরী নদী দ্রুত বাড়ছে এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সতর্ক করেছে যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা ও আসামেও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উজানের পানি এই অঞ্চলে আরও চাপ তৈরি করছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদী বিপদসীমা অতিক্রম করার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, যা নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সাথে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলের ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কতা স্তরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইডউই) রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উজান ও ভাটি-উভয় অঞ্চলেই যদি আগামী আরও ২-৩ দিন এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তবে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদী সংলগ্ন এলাকাগুলোতে একটি স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এই চরম আবহাওয়ার কারণে কুড়িগ্রামের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদীর তীরবর্তী ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির জন্য নতুন করে বড় ধরনের উদাসীনতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
নোয়াখালীর হাতিয়ায় জোয়ারের পানিতে বাড়িঘর, রাস্তা, ফসলি জমি ও মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে অনেক পরিবার দিনের পর দিন রান্না করতে পারছে না। ভোলার মনপুরায় একই অবস্থা। পটুয়াখালীতে সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম, কঙ্বাজার, মোংলা ও পায়রা বন্দরে স্থানীয় সতর্কতা সংকেত ৩ জারি রয়েছে।
এবারের বন্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি একই সময়ে তিনটি অঞ্চলকে আঘাত করছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র-র নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার একযোগে পানি বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করে, ২০০৪ সালে এই দুটি অববাহিকার সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ একই সময়ে মিলিত হয়ে ৩০,০০০ বর্গকিলোমিটার প্লাবিত করেছিল। ২০২২-এর মেঘনা বন্যা ও ২০২৪-এর বিধ্বংসী বন্যায় ১.৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংসদে উপস্থাপিত তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত শুধু বন্যায় বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে ২৯,২৭৭ কোটি টাকা। এই মৌসুমে জুলাই-আগস্ট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, ঐতিহাসিক তথ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলো (১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০২২, ২০২৪) এই দুই মাসেই ঘটেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তা বরাদ্দ, ৩,৪৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ এবং কঙ্বাজার, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ১,০০০+ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে যেখানে ১২,০০০-এর বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে বিলম্ব ছাড়াই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ১২টি উপকূলীয় জেলায় একটি করে বিশেষায়িত উদ্ধার স্পিডবোট এবং পাঁচটি বন্যাপ্রবণ জেলায় ৪৩টি অগভীর পানির উদ্ধার নৌকা মোতায়েন করছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র-এর আগামী ৪৮ ঘণ্টার পূর্বাভাস অনুযায়ী সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৩০০-৩৫০ মিলিমিটার এবং চট্টগ্রাম-ফেনী-লক্ষ্ণীপুর-নোয়াখালীতে ২৫০-৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টির পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় এই মুহূর্তে বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা, স্থানীয় প্রশাসনের স্থানান্তর নির্দেশ মানা এবং পরিবারভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি কাজ। যেহেতু বাংলাদেশ বৃষ্টি বা নদীর উপচে পড়া থামাতে পারবে না, তাই প্রতিটি পরিবার, সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠান আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, যার জন্য সরকারের উচিত পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে উপকূলীয় নদীর পূর্বাভাস ৩ দিন থেকে ৭ দিনে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদী ব্যবস্থাপনায় পলি অপসারণ, চ্যানেল সংস্কার, নদী দখল উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক বন্যা প্রশমন ব্যবস্থা হিসেবে জলাভূমি পুনরুদ্ধার, নগরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করা। একই সাথে স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে নিষ্কাশন খাল রক্ষণাবেক্ষণ, প্লাবনভূমিতে নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বন্যা প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি জনগণকে শুষ্ক খাবার মজুদ ও পরিবারের দুর্বল সদস্যদের (বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী) সুরক্ষা পরিকল্পনাসহ সম্প্রদায়ভিত্তিক বন্যা ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে হবে; তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা, কারণ বাংলাদেশের বন্যার ৯২ শতাংশ পানি উজান থেকে আসায় ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সাথে জলতাত্ত্বিক তথ্য বিনিময় এবং অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ একা ১৯৮৮ সালের ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়া স্তরের বন্যার সংকট সামলাতে পারবে না, তাই পরবর্তী বন্যার আগমনকে মেনে নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের মাধ্যমে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের জন্য আমাদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

লেখক ঃ মোছা: মাকছুদা খাতুন, প্রভাষক, ভুগোল বিভাগ, এপিবিএন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।

উপরে