বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনেজ সংকট: বৃষ্টি নয়, ব্যর্থ নগর পরিকল্পনাই আসল দুর্যোগ
বগুড়া জেলা সদরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিয়ে গত পাঁচ বছরের মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা, খান্দার-ফুলতলা সড়ক, ঠনঠনিয়া, চেলোপাড়া, নারুলী, কৈপাড়া, সেউজগাড়ি, বাদুরতলা, জাহেদ মেটাল, বড়গোলা, লতিফপুর কলোনী, জলেশ্বরীতলা, আযিযুল হক কলেজ এলাকা, বনানী, রেলগেট, জেলখানা মোড় ও চারমাথা এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে ডুবে যায় এবং এই দৃশ্যটি ২০২১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিটি বর্ষায় একই রকম পুনরাবৃত্তি হয়ে এসেছে। ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তন ও ৪,৮৬,০১৬ জন জনসংখ্যার এই ঐতিহাসিক শহরটি দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল, যা অবশেষে ২০২৬ সালে পূরণ হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়-কেন এই দীর্ঘ ১৯ বছর শহরটিকে প্রশাসনিকভাবে অবহেলিত থাকতে হলো এবং এই অন্তর্বর্তী সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও যুগোপযোগী মহাপরিকল্পনার অভাবে শহরের ড্রেনেজ কাঠামোর কী অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
১৯ বছরের অবহেলা: একটি তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা
২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে বগুড়া পৌরসভার আয়তন ১৪ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করা হয়, যার ফলে ওয়ার্ড সংখ্যা ১২ থেকে ২১-এ দাঁড়ায় এবং আশপাশের ৪৮টি মৌজা এর সাথে যুক্ত হয়। কিন্তু দেশের বৃহত্তম পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ ১৯ বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গতিহীনতার কারণে বগুড়া তার প্রাপ্য সিটি কর্পোরেশনের মর্যাদা পায়নি, যা আউটলুক বাংলা (২০ এপ্রিল ২০২৬) এবং পতাকা নিউজ (৭ মে ২০২৬)-এর প্রতিবেদনে বিস্তারিত উঠে এসেছে। দৈনিক ইনকিলাব (৮ মে ২০২৬)-এর ভাষায়, "দীর্ঘ ১৯ বছরের অপেক্ষা ও স্থানীয় মানুষের দাবির পর" অবশেষে এই কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি এসেছে; তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বিগত সরকারের আমলে এ সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাঠামো ধীরগতিতে চলায় পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি সরবরাহে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
এই ১৯ বছরের অবহেলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে শহরের ৭০০ থেকে ১,২১০ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিবেশ, যার ফলে করতোয়া নদী দূষণ রোধে গৃহীত ৩০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি এবং তৎকালীন মেয়র ও বর্তমান সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা নিজেই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৪ মার্চ ২০২৩)। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, বগুড়া জেলা কারাগারের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া নদীতে ফেলা হতো, এখনও হচ্ছে এবং জেলা সুপার আনোয়ার হোসাইন স্বীকার করেন যে, এটি শুধু কারাগারের নয় বরং পুরো শহরের বর্জ্যের একটি চিত্র। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ইন্টার প্রেস সার্ভিস (আইপিএস, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬) তাদের এক তথ্যচিত্রে করতোয়াকে "একটি বিভক্ত, দূষিত চ্যানেল" হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে জলবায়ুর চাপ, নগরীয় দখল, দূষণ ও প্রবাহ বিঘ্ন নীরবে মানুষের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে; যা বাংলাপিডিয়া-র তথ্য দ্বারাও সমর্থিত, যেখানে বলা হয়েছে ব্রহ্মপুত্র রাইট এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণের পর থেকে নদীটির সর্বোচ্চ প্রবাহ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৩,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে এসেছে।
সুবিল খাল ও আঞ্চলিক জলাবদ্ধতার রূপচিত্র
নদীর পাশাপাশি বগুড়া শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান প্রাণরেখা ‘সুবিল খাল’ (সুত্রাপুর ফাড়িয়া খাল) অবৈধ দখল ও ভরাটে কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে, যা একসময় শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের বৃষ্টির পানি করতোয়ায় নিয়ে যেত। এই প্রাকৃতিক জলকপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জেলার অববাহিকা জুড়েই মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতার জন্ম হয়েছে; যেমন দৈনিক ভোরের দর্পণ (৫ মে ২০২৬)-এর খবর অনুযায়ী, কাহালু উপজেলায় নয়নজলি ও কালভার্ট বন্ধ করে প্রভাবশালী মহলের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে ২০২৬ সালের মে মাসে ১৫০ হেক্টরের বেশি বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়া দৈনিক ইনকিলাব (২০২৬)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধুনট পৌরসভাতেও পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কগুলো জলমগ্ন হয়ে পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, যা শহরের পাশাপাশি পুরো জেলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ: নতুন আশার সূচনা
বিগত ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশে বর্তমান সরকার গঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বগুড়াকে অবিলম্বে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের নির্দেশ দেন। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম সভায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তিনি নিজে বগুড়ায় এসে দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, যা বাংলাদেশ প্রতিদিন (২০ এপ্রিল ২০২৬) ও পার্বত্য নিউজ (২০ এপ্রিল ২০২৬) গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে। এই সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী গাবতলী উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন, যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে নতুন সরকারের আন্তরিকতার একটি দৃশ্যমান প্রমাণ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন (১৯ মে ২০২৬)-এর তথ্য অনুযায়ী, নবগঠিত এই সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক বরাদ্দ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দৈনিক ইনকিলাব (৮ মে ২০২৬)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ মে ২০২৬ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে; যেখানে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম পরামর্শ দিয়েছেন যে, সরকারকে প্রথমেই পুরো শহরকে একটি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনতে হবে, যার মধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ থাকবে।
প্রশাসনিক রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা কেবল একটি নাম পরিবর্তন নয়, বরং এটি ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের একটি সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বশর্ত; কারণ পৌরসভা হিসেবে বগুড়ার বাজেট ও জনবল সীমিত থাকলেও এখন কর্পোরেশন হিসেবে বড় পরিসরে ড্রেনেজ আধুনিকায়ন ও সরকারি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে (আউটলুক বাংলা, ২০ এপ্রিল ২০২৬)। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন এই পৌর প্রতিষ্ঠানটি ১৯ বছর পর তার প্রাপ্য সম্মান পেলেও, এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রশাসনিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত একটি সমন্বিত মাস্টার ড্রেনেজ প্ল্যান প্রণয়ন করা। একই সাথে, পরিত্যক্ত ৩০০ কোটি টাকার করতোয়া শোধন প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, সুবিল খাল সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে পুনর্খনন করা এবং ২১টি ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ম্যাপিং করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নতুন ড্রেন নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। বগুড়াবাসী দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বঞ্চনা সহ্য করে অপেক্ষা করেছে, তাই এখন তারা নাম পরিবর্তনের কাগুজে স্বীকৃতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টেকসই ফলাফল দেখতে চায়। বখতিয়ার খলজির আমলে যে করতোয়া নদী গঙ্গার চেয়েও তিনগুণ প্রশস্ত ছিল, তা মানুষের লোভে নর্দমায় পরিণত হওয়ার পরিণতি আমাদের এই বার্তাই দেয় যে-নাগরিকদের ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; কারণ নদী ও প্রাকৃতিক খালগুলো বাঁচলে তবেই ড্রেন কাজ করবে এবং বগুড়া শহর চিরতরে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
লেখকঃ মোছা: মাকছুদা খাতুন, প্রভাষক, ভুগোল বিভাগ, এপিবিএন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।
