
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর পোস্টের জেরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরই মধ্যে ঘটনার তিন দিন পর দায়ের হওয়া মামলায় অজ্ঞাত ১,২০০ জনকে আসামি করায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুলাই রাত ৮টা ৩০ মিনিটে গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি এলাকা থেকে রঞ্জন রায় নামে এক যুবককে আটক করা হয়। তিনি আলদাদপুর ছয়আনি গ্রামের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। অভিযোগ, তিনি মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তিমূলক ও অবমাননাকর পোস্ট দেন।
ঘটনার পর হিন্দু পাড়ায় উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রতিবাদ মিছিল থেকে একটি হিন্দু বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সামান্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আদালতের নির্দেশে রঞ্জন রায়কে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
এ ঘটনার তিন দিন পর, ২৯ জুলাই বিকেলে রঞ্জনের দাদা রবীন্দ্রনাথ বাদী হয়ে গঙ্গাচড়া মডেল থানায় ভাঙচুরের অভিযোগে অজ্ঞাত ১,২০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালত তাদের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
এদিকে মামলা হওয়ার পর গঙ্গাচড়া ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বাংলাবাজার, হাজীপাড়া, মাগুড়া, বকসিপুর, মাছুয়াপাড়া, তেলমনপাড়া ও সবুজপাড়ার অনেক পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। এতে গ্রামগুলো কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
মাছুয়াপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা কালা মিয়া বলেন, “মানুষ ভয় পাচ্ছে, কেউ ঘরে থাকছে না। সেনাবাহিনী এসে ধরে নিয়ে যাবে—এমন আতঙ্কে আছি।”
বাংলাবাজারের কৃষক মোহাম্মদ সালাম বলেন, “মাঠে কাজ করি, কারও সঙ্গে ঝামেলা নেই, তবু মামলার ভয়ে রাতে বাড়ি ফিরি না।”
হাজীপাড়ার গৃহবধূ রেখা বেগম বলেন, “পুরুষরা বাড়ি ছেড়ে গেছে। আমরা শুধু সন্তানদের নিয়ে ঘরে আছি। বাইরে কেউ হাঁটলেও মনে হয় পুলিশ এসেছে।”
মাগুড়া গ্রামের দোকানদার কামাল উদ্দিন জানান, “আগে দোকান খোলা থাকত রাত ১০টা পর্যন্ত, এখন সন্ধ্যার আগেই বন্ধ করি।”
সবুজপাড়ার এক কলেজশিক্ষার্থী বলেন, “সামান্য কয়েকজনের ভুলে নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পাচ্ছে। এতে পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।”
বকসিপুরের প্রবীণ নারী মনোয়ারা খাতুন বলেন, “ধর্ম নিয়ে কটূক্তি মেনে নেওয়া যায় না, তবে যারা দোষী নয়, তাদের যেন হয়রানি করা না হয়।”
সিংগেরগাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী সিকান্দার আলী বলেন, “রঞ্জনের পোস্টের কারণে এখন হিন্দুপাড়ায় পাহারা, আর মুসলিমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”
রঞ্জনের বাবা সুজন কুমার ও মা মিনতি রাণী বলেন, “আমাদের ছেলে যদি দোষ করে থাকে, তবে তার উপযুক্ত শাস্তি হোক।”
ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু বাড়িগুলোর পুনর্নির্মাণের জন্য সরকারিভাবে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য পরেশ জায়। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও সহায়তা করা হয়েছে।
রংপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আনিচুর রহমান লাকু বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বিএনপির পক্ষ থেকে শাড়ি, লুঙ্গি ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। আমাদের কর্মীদের বলেছি, যাতে কোনো ধরনের উত্তেজনা না ছড়ায়।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী রায়হান সিরাজী বলেন, “ধর্ম অবমাননা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেই পোস্টের সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের কোনো সম্পর্ক নেই। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।”
গঙ্গাচড়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আল এমরান বলেন, “রবীন্দ্রনাথের দায়ের করা মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের থানাধীন এলাকায় মানুষ আতঙ্কে আছে। তাদের আশ্বস্ত করেছি, নিরপরাধ কাউকে গ্রেফতার করা হবে না।”
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, “ঘটনার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর মেরামত সম্পন্ন করা হয়েছে। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।”