সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারের পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জয়সাগর দিঘি—যার বয়স প্রায় ৫০০ বছর। জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ দিঘিটি ইতিহাস, লোককথা, এবং প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য নিয়ে এখনো টিকে আছে।
প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে, রাজা অচ্যুত সেন ১৫৩২-৩৪ খ্রিষ্টাব্দে বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় লাভের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই দিঘিটি খনন করেন। দিঘির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় আধা মাইল, আয়তন প্রায় ৫৮ একর। খননের সময় ২৮টি শানবাঁধানো ঘাট নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
দিঘিটির সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে বহু রূপকথা ও কিংবদন্তি। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ যেমন নগেন্দ্রনাথ বসু মনে করেন, এই দিঘি খনন করেছিলেন এক বিরাট রাজা, যার অপর নাম অচ্যুত সেন। তিনি রাজসত্তার গর্বে ১২ জন রাজাকে হত্যা করে পরে পাপমোচনের উদ্দেশ্যে এ দিঘি খনন করেন। আবার লোকমতে, জয়কুমার নামের এক রাজপুত্র বেলপাতা ফেলে দিঘিতে পানি তুলেছিলেন, পরে সেই পানিতে ডুবে যান—এ ঘটনা থেকেই দিঘির নাম হয় জয়সাগর।
এই দিঘিকে ঘিরে আছে আরও নানা কাহিনি। বলা হয়ে থাকে, কচুরিপানার মাঝখানে ছিল একটি বেলগাছ, আর সে থেকেই প্রচলিত হয় জনপ্রিয় প্রবচন: "যার মাথায় আছে তেল, সে খাবে জয়সাগরের বেল!"
বর্তমানে দিঘির চারপাশে গড়ে উঠেছে বসতি। আশির দশক থেকে গ্রামীণ মৎস্য ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এখানে মাছ চাষ হতো। বর্তমানে এটি সরকারিভাবে নিমগাছী সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে সুফলভোগীরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
শীতকালে এই দিঘিতে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি এসে জমায়েত হয়। তখন বেড়াতে আসা পর্যটকদের ভিড়ও বাড়ে। তবে বিশ্রামের জন্য নেই কোনো রেস্টহাউস, বসার জায়গা, খাবার কিংবা স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা, যা পর্যটকদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান বলেন, “ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে হস্তান্তরের পর মৎস্য বিভাগ এখানকার সুফলভোগীদের সংগঠিত করে মাছ চাষ পরিচালনা করছে। এতে অনেকেই আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।”
প্রাচীন ইতিহাস ও নানান জনশ্রুতি ঘেরা জয়সাগর দিঘি কেবল একটি জলাশয় নয়, বরং এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের জীবন্ত নিদর্শন।