শিশু প্রীতম ও প্রিয়সী দুই ভাই-বোন। তাদের মা’র ইচ্ছে ছিল দুই সন্তানকে পড়াশোনা করানোর। ছেলে মেয়ে বড় হওয়ার আগেই মা পূর্ণিমা চিকিৎসার অভাবে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বাবা থেকেও নেই। মাকে হারিয়ে পৃথিবীটা যেন তাদের অন্ধকার হয়ে গেছে। থমকে যেতে বসেছে অসহায় এই দুই ভাই-বোনের পড়াশোনার স্বপ্ন।
১১ বছর বয়সি প্রীতম ও ৭ বছর বয়সি প্রিয়সী নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের কুজাইল হিন্দুপাড়া গ্রামের স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন ডাবলু প্রামানিকের সন্তান। জন্মের পর থেকেই তাদের জীবনের পথে যেন শুধু হারের গল্প। ছোট্ট দুই শিশুর মা পূর্ণিমা চিকিৎসার অভাবে গত ১১ এপ্রিল নিজ বাড়িতে মারা গেছেন।
মৃত্যুর একদিন আগেও প্রীতম ও প্রিয়সীর মা’র ইচ্ছে ছিল তার দুই সন্তানকে পড়াশোনা করিয়ে উচ্চ শিক্ষিত করার। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। এখন হাত পেতে কিনতে হচ্ছে ছেলে প্রীতমের ৭ম শ্রেণির গাইড-বই। অসুস্থ হলে ঔষধ কেনার জন্য সাহায্য চাইতে হচ্ছে অন্যের কাছে।
মা হারা হয়েও থামেনি ছোট্ট দুই শিশুর স্বপ্ন। সকালে পুরোনো ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে তারা স্কুলে যায়। অন্যদের মতো নতুন পোশাক, দামি খাতা কলম নেই। অনেক সময় না খেয়েই ক্লাস করতে হয় তাদের। তবুও স্কুলে গিয়ে পড়তে চায়, বন্ধুদের মতো স্বপ্ন দেখতে চায় প্রিতম-প্রিয়সী।
তাদের বাবা কখনো কখনো গুড়-মুড়ির ব্যবসা করেন, আবার কখনো ঘুরে বেড়ে খায়। কোনমতে চলেন তিনি। এখন দুই শিশুর একমাত্র ভরসা কাকা (চাচা) পলাশ প্রামানিক। মৃত বৌদির (ভাবির) স্বপ্ন পূরণের আশায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পলাশ। এখন দুই শিশুর সব দায়িত্ব যেন কাকা (চাচা) পলাশের কাঁধে। জীবনের ভারের চেয়ে দায়িত্বের ভারই এখন তার বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলাশের জীবনের গল্পটাও করুন। তার ভাগ্যেও কখনও জোটেনি ভালো কিছু খাবার, হয়নি সামর্থ্য নতুন পোশাক কেনার। পলাশের যে ঘরে রাত কাটে হয়তো, সেই ঘর থেকে কারো কারো গবাদি পশুর থাকার ঘরও এর চেয়ে ভালো হয়ে থাকে। তবুও রাত কাটছে তার। একই ঘরের মধ্যে খাওয়া, আছে জঙ্গল। বুদ্ধির পর থেকেই সুখ নামক শব্দটি তার কপালে জোটেনি। পলাশ গ্রাজুয়েশন শেষ করেও চাকরির পিছনে না ছুটে গ্রামে গ্রামে সিঙ্গাড়া বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালান। নিজের সংসারে চাল-চুল না থাকা সত্তে¡ও ছোট্ট দুই শিশুকে আগলে রেখেছেন মায়ের মতো করে।
কিন্তু এই লড়াইয়ে পলাশ একা। অভাবের ঘূর্ণিপাকে হয়তো যেকোনো সময় থেমে যেতে পারে প্রীতম আর প্রিয়সীর স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন। সমাজের এগিয়ে আসা ছাড়া হয়তো স্বপ্নগুলো স্বপ্নই থেকে যাবে, ঝরে যাবে নিমিষেই।
হতাশা নিয়ে পলাশ প্রামানিক বলেন, নিজের সংসারও চলে না ঠিকমতো। তবু ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, স্কুলে যেও, মানুষ হইও। ওদের পড়াশোনা থেমে গেলে আমার মন ভেঙে যাবে। কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত ওদের পাশে থাকবো। তিনি বলেন, এলাকায় যেকোনো একটা চাকরির সুযোগ পেলে আমার জন্য খুব ভালো হতো। জীবনে নিজের জন্য কখনও পোশাক কিনতে পারিনি। একজনের মাধ্যমে একবার দুই বান্ডিল টিন ও কিছু টাকা পেয়ছিলাম, সেই টিন দিয়ে ঘর ঠিক করেছি। তারপরও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা, বেঁচে আছি।
শিশুর বাবা ডাবলু প্রামানিক বলেন, আমি তেমন কাজ কাম করতে পারিনা। এক সময় পেডেল আলা ভ্যান চালাতাম। এখন মাঝে মাঝে গুড় ও মুড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে যাই। তেমন একটা বেচাকেনা হয় না। ছেলে-মেয়ে অসুস্থ হলে ঔষধই কিনতে পারি না। পড়াশোনা করামু কেমন করে?
প্রীতম বলেন, আমরা দুই ভাই বোন পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু কিভাবে করব জানিনা, আমার একটা গাইড কিনতে হয়েছে সাহায্য নিয়ে। আমার মা বেঁচে থাকলে তেমন চিন্তা হতো না। “ভাই-বোন প্রীতম ও প্রিয়সীর একটাই আকুতি আমরা পড়তে চাই মানুষ হতে চাই। আমাদের স্বপ্ন যেন না মরে যায়।”
প্রতিবেশীরা জানান, ডাবলু প্রামানিকের স্ত্রী পূর্ণিমা মারা যাওয়ায় তার দুটো সন্তান অসহায় হয়ে পড়েছে। পূর্ণিমা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার ও দুই সন্তানের পড়াশোনা চালাচ্ছিলেন। এখন ছোট্ট দুই শিশুর কি হবে? কেমনে চলবে তাদের পড়াশোনা।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, আমি তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিবো। এরপর তাদের জন্য যেভাবে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় আমি চেষ্টা করবো।