বগুড়ায় প্রায় শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে পুলিশের আলোচিত সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি হামিদুল আলম মিলন, তার স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপি ও তিন বোনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুদক বগুড়া জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম।
দুদকের দায়ের করা এক মামলায় সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি হামিদুল আলম মিলন ও তার তিন বোন—আজিজা সুলতানা, আরেফা সালমা ও শিরিন শবনমের বিরুদ্ধে ২৭ কোটি ৬০ লাখ ৩ হাজার ৯০৫ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন এবং অসাধু উপায়ে আরও ৩৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৫ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্য মামলায় হামিদুল আলম মিলনের স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপি ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৮ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন এবং স্বামীর অবৈধ সহায়তায় ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলের অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল দুদক বগুড়া জেলা কার্যালয় থেকে হামিদুল আলম মিলন ও তার স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপির নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে একই বছরের ২৩ জুন তারা দুজনই নিজ নিজ স্বাক্ষরে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, হামিদুল আলম মিলনের মা ও তিন বোন সবাই গৃহিণী এবং তাদের কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। অথচ তাদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করা হয়। দুদকের মতে, হামিদুল আলম মিলন ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তার মা ও বোনদের নামে সম্পদ কিনে পরবর্তীতে হেবা দলিলের মাধ্যমে নিজের নামে স্থানান্তর করেন। তার মা রওশন আরা বেগম ২০২০ সালের এপ্রিলে মৃত্যুবরণ করায় তাকে মামলায় আসামি করা হয়নি।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হামিদুল আলম মিলন তার পদমর্যাদা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন, যা দুর্নীতি দমন আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যদিকে শাহাজাদী আলম লিপির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, তিনি স্বামীর সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জন করেন এবং সম্পদের উৎস গোপন করতে তা হস্তান্তর বা স্থানান্তর করেন।
শাহাজাদী আলম লিপি তার সম্পদ মা সাফিয়া খাতুনের কাছ থেকে পেয়েছেন বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে দুদক জানতে পারে, তার মা একজন গৃহিণী এবং বাবা শহীদুল্লাহ মন্ডল ছিলেন পল্লি চিকিৎসক। অভিযোগে বলা হয়, হামিদুল আলম মিলন প্রথমে শাশুড়ির নামে সম্পদ ক্রয় করেন এবং পরে সেগুলো হেবা দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপির নামে হস্তান্তর করা হয়।
দুদকের মতে, সাফিয়া খাতুন তার অন্যান্য সন্তানদের না দিয়ে কেবল পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপিকেই বিপুল সম্পদ হেবা করেন, যা পারস্পরিক যোগসাজশে সম্পদের উৎস গোপনের প্রমাণ বহন করে। সাফিয়া খাতুন ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করায় তাকেও মামলায় আসামি করা হয়নি।
মামলার বাদি দুদকের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, নিবিড় অনুসন্ধানে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি হামিদুল আলম মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, শাহাজাদী আলম লিপি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সোনাতলা-সারিয়াকান্দি) আসন থেকে প্রার্থী ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। ওই সময় সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তার স্বামী হামিদুল আলম মিলনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দীর্ঘদিন বরখাস্ত থাকার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হলেও একই মাসে তাকে পুলিশের চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।