বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপস্থিতিতে ‘রাজনৈতিক স্লোগান’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ ঝেরেছেন একদল শিক্ষার্থী।
বুধবার রাত ১টার দিকে ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলন করে তারা বলেছেন, বুয়েটে যেকোনো রাজনৈতিক দলের যেকোনো কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।
নিজেদের নাম প্রকাশ না করে শিক্ষার্থীরা বলেন, “আজ ঢাকা-৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী তার বিভিন্ন মসজিদে জনসংযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারাবির নামাজ পড়তে আসেন। যেহেতু মসজিদ সবার জন্য উন্মুক্ত সেখানে নামাজ পড়ার অধিকার সবাই রাখেন।
“কিন্তু নামাজ শেষে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর সঙ্গে রাজনৈতিক স্লোগান বুয়েটকে অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসে বজায় রাখতে আমাদের যে অঙ্গীকার, তার পরিপন্থি।”
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “আবরার ফাহাদ এবং সাবেকুন্নাহার সনি দুইজন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থীর আত্মত্যাগ আমাদের জন্য শুধু শোকের নয়, একটি দায়বদ্ধতার নাম। তাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা বুয়েটে একটি অরাজনৈতিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।
“ছাত্ররাজনীতির ভয়াল ও সহিংস রূপ কেবল জীবন কেড়ে নেয়নি; বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎও ধ্বংস করেছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা যেকোনো মূল্যে বুয়েটকে রাজনীতিমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেছি।”
ক্ষোভ প্রকাশ করা শিক্ষার্থীরা বলেন, “বুয়েটের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত শিক্ষার্থী হিসেবে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়। ক্যাম্পাস হবে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের নিরাপদ ও নিরপেক্ষ ক্ষেত্র; কোনো রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র পরিবেশকে ব্যবহার করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক বার্তা প্রদান শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষুণ্ন করে।
“বুয়েটে যেকোনো রাজনৈতিক দলের যেকোনো কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। অতীতের ত্যাগ ও রক্তের ঋণ স্মরণে রেখে ভবিষ্যতেও রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।”
এদিকে রাত ১টা ১০ মিনিটে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী এক ফেইসবুক পোস্টে বলেন, “আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কয়েকজন ভাইয়ের আমন্ত্রণে সেখানে তারাবির নামাজ আদায় করতে যাই। নামাজে যাওয়ার পর একজন এসে জানান, অরাজনৈতিক ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বক্তব্য দেওয়া যাবে না। আমি সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নিয়ে বলি, তারাবির নামাজ আদায় করে চলে যাবো।
“নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় আবারও আমাকে কিছু না বলার জন্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় এবং মিডিয়া ব্রিফিং না করার অনুরোধ জানানো হয়। আমি সেটিও সম্মানের সাথে গ্রহণ করি। সেখানে আমি শুধু শহীদ আবরার ফাহাদ এবং শহীদ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করি।
“পরবর্তীতে পলাশীতে এসে প্রেস ব্রিফিং করি এবং সবার সঙ্গে কথা বলি। এ সময় কয়েকজন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিলে আমি নিজেই তাদের থামিয়ে দেই।”
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর এক ‘জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে’ ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
আবরার ফাহাদের ছোট ভাই, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজ বুধবার রাতে ফেইসবুকে লিখেছেন, “বুয়েটের আজকের এই ছাত্ররাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস দুইটা জীবনের বিনিময়ে পাওয়া, শত শত পোলাপানের নিজেদের ক্যারিয়ারের চিন্তা না করে দিন-রাত এক করে দেওয়া শ্রমের ফল।
“আমি জানি না নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভাই জানতেন কি না যে বুয়েট এরিয়া কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জায়গা না। উনার এখানে এসে লাভ কী হলো তাও জানি না।
“কিন্তু উনি এসে ঠিক কতটা ক্ষতি যে আমাদের করলেন, তা বুঝতে দীর্ঘ সময় লাগবে।”
ঘটনার বিষয়ে জানতে বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
তবে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম মাসুদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।