ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তার: গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট ও উত্তরণের পথ | Daily Chandni Bazar ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তার: গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট ও উত্তরণের পথ | Daily Chandni Bazar
logo
প্রকাশিত : ৪ মার্চ, ২০২৬ ০০:২৫
ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তার: গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট ও উত্তরণের পথ
আল-মামুন, নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক চাঁদনী বাজারঃ

ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তার: গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট ও উত্তরণের পথ

সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ—এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটির অন্তর্নিহিত অর্থ গভীর। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমই জনগণের পক্ষে প্রশ্ন তোলে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়া-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তার গণমাধ্যমের সেই মৌলিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বগুড়া প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়া-এর নেতৃবৃন্দ যৌথ বিবৃতিতে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার বানিয়ে কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপপ্রচার ও মাসোহারা আদায়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন—এমন অভিযোগ জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি করছে।
সাংবাদিকতার মূলধন হলো আস্থা। সেই আস্থা গড়ে ওঠে তথ্য যাচাই, বহুমাত্রিক সূত্রের ব্যবহার, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু ঘটনাস্থলে না গিয়ে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য না নিয়ে, যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি অসংলগ্ন বাক্য পোস্ট করে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দেওয়ার প্রবণতা পেশাটিকে হাস্যকর ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এতে একদিকে যেমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত পরিবেশও জটিল হয়ে উঠছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু ব্যক্তি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে পরে তা ‘সমাধান’ করার নামে আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন। এটি কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়; এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার আড়ালে এমন কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে এবং প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করে।
ডিজিটাল যুগ তথ্যপ্রবাহকে গণতান্ত্রিক করেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু এই উন্মুক্ততার সুযোগ নিয়ে পেশাগত মানদণ্ড উপেক্ষা করলে তা সমাজে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে। সাংবাদিকতা কখনোই শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তার নাম নয়; এটি একটি প্রশিক্ষণনির্ভর, নৈতিকতা-ভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক পেশা। প্রশ্ন জাগে—যদি কেবল কয়েকটি পোস্ট দিলেই সাংবাদিক হওয়া যায়, তবে সাংবাদিকতা শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের শ্রমের মূল্য কোথায় দাঁড়ায়?
এই প্রেক্ষাপটে করণীয় স্পষ্ট।
প্রথমত, প্রশাসনকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভুয়া পরিচয়ে চাঁদাবাজি বা প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত সাংবাদিকদের একটি সমন্বিত নিবন্ধন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে জনসাধারণ সহজেই পেশাদার সাংবাদিকদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেন।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম সংগঠনগুলোকে সদস্যপদ প্রদান ও পরিচয়পত্র ইস্যুর ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
চতুর্থত, নাগরিক সমাজ ও পাঠকদেরও সচেতন হতে হবে—যাচাইহীন তথ্য শেয়ার না করা এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি তার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার নামে অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্রই।
ভুয়া সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য বন্ধে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশাসন, গণমাধ্যম সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত পদক্ষেপই পারে সাংবাদিকতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে। অন্যথায় আস্থার যে ভিত্তির ওপর গণমাধ্যম দাঁড়িয়ে আছে, তা ভেঙে পড়তে সময় লাগবে না।
গণমাধ্যমের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে আপসের কোনো সুযোগ নেই, তাই এখনই কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ গ্রহন করার সময়।