নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় শতাধিক সরকারি খাস পুকুর মামলার বেড়াজালে (ফাঁদে) পরে বছরের পর বছর ধরে সরকারের বেদখল হয়ে আছে। বিভিন্ন চক্র জনস্বার্থের নাম এবং স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরের উন্নয়নের নামে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে মিথ্যা বিষয়ে মামলা করে সেই পুকুরগুলো সরকারি রাজস্ব না দিয়ে অবৈধভাবে ভোগদখল করে আসছে। এতে করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দ্রুত এসব মিথ্যা মামলার ফাঁদ থেকে সরকারি খাস পুকুরগুলো রক্ষা করে নিয়ম অনুযায়ী ইজারার আওতায় আনতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সচেতন মহল।
জানা গেছে, উপজেলায় সরকারের রাজস্বভুক্ত মোট ৫৮৫টি খাস পুকুর রয়েছে। এরমধ্যে ছোট-বড় মিলে শতাধিক খাস পুকুর বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মামলার বেড়াজালে পড়ে আছে। কিছু চক্র উপজেলার যে পুকুরগুলো থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বেছে বেছে সেই পুকুরগুলোতে জনস্বার্থে ব্যবহার ও স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরের উন্নয়নে ব্যবহারের কথা বলে এবং ব্যক্তিস্বার্থে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করে নিজেদের আওতায় নিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ভোগদখল করে আসছে। আর মামলার বেড়াজালে ফেলে দখলকারীরা সরকারি ওইসব পুকুর অন্যের কাছে লিজ দিয়ে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার কালীগ্রাম ইউনিয়নের রামজীবনপুর মৌজার ২৮০ নম্বর দাগে ১.৭০ শতাংশ পুকুরটি জনস্বার্থে ব্যবহার ও স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের নামে ১৯৮৮সালে মামলা করা হয়। এরপর থেকে পুকুরটি আর ইজারার আওতায় আসেনি। পরবর্তীতে মামলার রায় সরকারের পক্ষে গেলে ২০০৮ সালে রামজীবনপুর গ্রামের মোজার আলী জনসাধারণের পক্ষে পুনরায় আদালতে মামলা দায়ের করলে এখন পর্যন্ত পুকুরটি মোজাহার আলী ভোগদখল করে আসছেন। একই ইউনিয়নের আমগ্রাম মৌজার কয়েকটি দাগে ৮টি পুকুরের উপর জনসাধারণের পক্ষে আমগ্রামের আব্দুল জব্বার নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে ২০০৭ সালে মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে পুকুরগুলো সরকারের বেদখল হয়ে আছে। সেই থেকে এই পুকুরগুলো আর ইজারার আওতায় আসেনি।
উপজেলার হরিপুর মৌজার ৫ একর ১৬ শতাংশের বড় পুকুরটিও ২০১৬ সালে জনসাধারণের পক্ষে হৃদয় চন্দ্র দিং আদালতে মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলার রায় বাদির অনুকূলে যাওয়ায় বর্তমানে ওই পুকুরটি হরিপুর গ্রামবাসীর নামে কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভোগ করে আসছে। একইভাবে উপজেলার তেবাড়িয়া মৌজার ৬টি পুকুর ২০০২ সাল থেকে জনসাধারণের পক্ষে তেবাড়িয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বকুল মামলা করেন। এরপর থেকে তেবাড়িয়া জামে মসজিদের পক্ষে জাহাঙ্গীর আলম বকুল পুকুরগুলো ভোগদখল করে আসছে।
এভাবেই উপজেলার সরকারি শতাধিক খাস পুকুর এলাকাবাসী, জনস্বার্থে ব্যবহার ও স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরের উন্নয়নে ব্যবহারের কথা বলে এবং ব্যক্তিস্বার্থে বিভিন্ন কৌশলে মামলার বেড়াজালে (ফাঁদে) ফেলে কিছু চক্র এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের আওতায় নিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ভোগদখল করে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দির কমিটির সদস্যরা বলেন, প্রতিষ্ঠানের নামে কিংবা জনসাধারণের ব্যবহারের নাম করে পুকুরগুলো মামলা করা হলেও পুকুর থেকে আয় হওয়া অর্থের নামমাত্র সামান্য কিছু অর্থ কোন কোন বছর পাওয়া যায়, আবার কোন কোন বছর পাওয়া যায় না। আর বাকি অর্থগুলো সমাজের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রভাবশালীদের পকেটে চলে যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে কোন এলাকার বাসিন্দারা আর পুকুরের পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে না। আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার যুগে সবাই গভীর নলকূপ ব্যবহার করে। মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে কতিপয় পুকুর খেকোরা মিথ্যা মামলার মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে লুটপাট করছে।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ কারো একার ভোগের জন্য নয়। যারা মিথ্যা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে খাস পুকুরগুলো ভোগদখল করে আসছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার কোন বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে দ্রুত মিথ্যা মামলা নিষ্পত্তি করে রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো উদ্ধার করার বিশেষ অনুরোধ জানান সরকারের প্রতি। এছাড়া সরেজমিনে পরিদর্শন সাপেক্ষে যে সকল পুকুর জনসাধারণের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার উপযোগী সেই পুকুরগুলো জনস্বার্থে উন্মুক্ত করে দিতে এবং অন্যগুলো ইজারার আওতায় আনার জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. রাকিবুল হাসান বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের বড় একটি খাত খাস পুকুর ইজারা। কিন্তু বিভিন্ন চক্র জনসাধারণের পক্ষে এবং স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরের উন্নয়নের নামে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে শতাধিক খাস পুকুরে আদালতে মামলা করে সরকারি রাজস্ব না দিয়ে সেই পুকুরগুলো ভোগদখল করে আসছে। আমরা ইতিমধ্যে মামলার ফাঁদে পড়া পুকুরগুলোর তালিকা তৈরি করেছি। সেই পুকুরগুলোর চলমান মামলা নিষ্পত্তি করে দ্রুত যেন ইজারার আওতায় আনা যায় সেই বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।