নওগাঁর নিয়ামতপুরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা করেছে দূর্বত্তরা। সোমবার রাতে কোন এক সময় উপজেলার বাহাদুরপর গ্রামে এ হত্যা কান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা নমির হোসেন, দুইবোন ডালিমা ও শিরিনা এবং ভাগিনা হোসেনকে(ডালিমার ছেলে) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। এ ঘটনার পর এলাকায় চরম উদ্বেগ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(ক্রাইম) জয়ব্রত পাল, থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মঙ্গলবার দুপুর ৩টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহতরা হলেন, নমির হোসেনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩০), তার স্ত্রী পপি খাতুন (২৫), ছেলে পারভেজ ইসলাম (৮) এবং আড়াই বছরের মেয়ে সাদিয়া রহমান।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূ্ত্রে জানা যায়- বাড়ির মালিক নমির হোসেনের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দেওয়ায় তারা অন্যত্র সংসার করছে। আর নমির হোসেন তার ছেলের পরিবারকে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করেন। গত কয়েক বছর নমির হোসেনের স্ত্রী মারা যান। এরপর বাড়িভিটাসহ ১০ বিঘা জমি তিনি ছেলেকে লিখে দেন। ১০ কাঠা করে আড়াই বিঘা প্রত্যেক মেয়েকে লিখে দেন এবং নিজের কাছে ৫ কাঠা রাখেন। হাবিবুর রহমানকে কেন বেশি জমি লিখে দেওয়া হয়েছে এ নিয়ে মেয়ে ও জামাইরা মাঝেমধ্যে হাবিবুরের সাথে দ্বন্দ্ব হতো। জামাইরা বিভিন্ন ভাবে হুমকি-ধামকিও দিতো। অবশেষে স্বপরিবারকে জীবন দিতে হয়েছে। তবে কারা হত্যা করেছে তা এখনো সঠিক করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। এক নজর দেখতে আশপাশের হাজারো মানুষ ভীড় করে। তবে কারা হত্যার সাথে জড়িত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানানো হয়।
সোমবার রাতে এক সঙে খাবার খেয়ে যে যার মতো ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। বাড়ির মালিক নমির হোসেন সকালে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে দেখেন বাড়ির দরজা খোলা রয়েছে। তারপর ছেলেকে অনেক ডাকাডাকি করেন। কোন সাড়া পাননি। পরে ছেলের ঘরে গিয়ে দেখেন বিছানা রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলে গলাকাটা অবস্থায় পড়ে আছে। পাশে ছেলের বউ ও নাতী-নাতনী গলাকাটা অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর তিনি চিৎকার শুরু করেন। পরে প্রতিবেশীরা এসে থানা পুলিশে সংবাদ দেয়। পরে থানা পুলিশ, ডিবি, সিআইডি ও র্যাব ঘটনাস্থলে যায়।
প্রতিবেশী নুরুজ্জামান, সাইফুল ও সুজন সহ কয়েকজন বলেন- দুইদিন আগেও হাবিবুর রহমান গরু বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ টাকা বাড়িতে রেখেছিলেন। টাকা-পয়সা ও স্ত্রীর গহনা অক্ষত অবস্থায় আছে। চুরি বা ডাকাতির কোন ঘটনা ঘটলে সেগুলো নিয়ে যেতো। কিন্ত সবকিছু পড়ে রয়েছে। চারটি জীবন এভাবে চলে গেলো।
নিহতের বাবা নমির হোসেন বলেন- ছেলেকে ১০ বিঘা আর প্রত্যেক মেয়েকে ১০ কাঠা করে জমি লিখে দেওয়া হয়। ছেলেকে কেন বেশি জমি লিখে দিয়েছি এ নিয়ে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে ঝগড়া হতো। সকালে ফজরের নামাজ পড়ারর জন্য ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়ির দরজা খোলা রয়েছে। ছেলেকে অনেক ডাকার পরও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তার ঘরের দরজায় গিয়েও ডাকাডাকি করা হয়। তার ঘরের দরজা খোলা ছিলে। ঘরে গিয়ে দেখি বিছানায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার বউ ও ছেলে-মেয়েও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব দেখে চিৎকার শুরু করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। বাড়ির প্রাচীর টপকে কেউ তাদের হত্যা করেছে।
এদিকে নিহত গৃহবধু পপি খাতুনের মা সাবিনা বেগম মেয়ের শোকে বার বার মুছা যাচ্ছেন। প্রচন্ড গরমে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়ছেন। স্থানীয়রা তাকে পাখার বাতাস করে কিছুটা স্বস্থি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মেয়েকে হারিয়ে বার বার প্রলাপ বকছেন।
সাবিনা বেগম বলেন- ১০-১২ বছর আগে হাবিবুরের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ে দেয়ার পর থেকে তাদের সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। এসব নিয়ে কয়েকবার সালিস হয়। এরমধ্যে দুই সন্তানও হয়। জামাইয়ের নামে বাড়িভিটাসহ ১০ বিঘা জমি তার বাবা লিখে দিয়েছে। এই জমি লিখে দেওয়ায় আমার মেয়ের কাল হয়েছে। জামাইয়ের ৫ বোন (ডালিমা, শিরিনা, সুফি, সাহানারা ও কমেলা) বিভিন্ন সময় ঝগড়া ও হুমকি দিতো। ওরা ৫বোন মিলে আমারে মেয়েকে খুন করেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার দাবী করছি। আর যেন কোন মায়ের কোল খালি না হয় ও শিশুদের এভাবে জীবন দিতে হয়।
নওগাঁ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন- এ হত্যা কান্ডে একাধিক ব্যক্তি অংশ নেয়। চুরি বা ডাকাতি হলে টাকা ও গহনা নিয়ে যেতো। কিন্তু সেগুলো অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ডাকাতি বা দস্যুতার কোন ঘটনা ঘটেনি। ধারালো অস্ত্র দিয়ে দুই শিশুসহ চারজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।