বগুড়া শহরের চারমাথা এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য বিপুল চন্দ্র পালের (৪৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক দাবির বিপরীতে সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে বোরকা পরিহিত এক নারীকে দেখা গেছে, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
শনিবার (৬ জুন) দুপুরে শহরের চারমাথা এলাকার সেঞ্চুরি মোটেলের ৬১০ নম্বর কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত বিপুল চন্দ্র পাল বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুইবারের নির্বাচিত ইউপি সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে শাহ ফতেহ আলী পরিবহনে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি এরুলিয়া পালপাড়া এলাকার মৃত জিতেন্দ্র নাথ পালের ছেলে।
পুলিশ ও হোটেল সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (৫ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিপুল চন্দ্র পাল মোটেলে একটি কক্ষ ভাড়া নেন। পরদিন নির্ধারিত সময় পার হলেও তার কোনো সাড়া না পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনদের উপস্থিতিতে কক্ষের দরজা খুলে তাকে বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর সেঞ্চুরি মোটেলের রিসেপশন ম্যানেজার প্রথমে দাবি করেছিলেন, বিপুল একাই কক্ষটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাত ৯টার দিকে তিনি হোটেলের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সেখান থেকে বোরকা পরিহিত এক নারীর সঙ্গে বের হয়ে ৬১০ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে রাতের কোনো এক সময় ওই নারীকে একাই কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।
বগুড়ার ফুলবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জালাল উদ্দীন জানান, নিহত ব্যক্তি মাঝেমধ্যে ওই হোটেলে আসতেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে কক্ষ থেকে যৌন উত্তেজক জাতীয় একটি সিরাপ, ঘুমের ওষুধ, কোমল পানীয় এবং পানির বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া নারীর পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।
এদিকে বিপুল চন্দ্র পালের পরিবার ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। পরিবারের অভিযোগ, ‘রক্সি’ নামের এক ব্যক্তি তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
নিহতের স্ত্রী জানান, শুক্রবার রাতে সর্বশেষ ফোনালাপে বিপুল তাকে বলেছিলেন, তিনি সারিয়াকান্দিতে রক্সি নামের এক ব্যক্তির বোনের বাড়িতে দাওয়াতে যাচ্ছেন এবং রাত করে ফিরবেন। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নিহতের মেয়ে তিথি বলেন, “বাবার মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। কক্ষ থেকে ওষুধ পাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি নিয়েও আমাদের সন্দেহ রয়েছে। বাবার মোবাইল ফোনও এখনো পাওয়া যায়নি। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”
বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক নূর আমিন মণ্ডল বলেন, “বিপুল চন্দ্র পাল অত্যন্ত ভদ্র ও সৎ মানুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন পরিবহন খাতে কাজ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না।”
এরুলিয়া ইউনিয়নের বর্তমান ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. নূর আলম বলেন, “বিপুল আমার ছোট ভাইয়ের মতো ছিল। এলাকায় তার কোনো শত্রুতা ছিল না। আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।”
বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। একই সঙ্গে সিসিটিভিতে দেখা নারীর পরিচয় এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।