প্রকাশিত : ৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫৬
হলফনামা বিশ্লেষণ: ৩১ শতক নয় হলফনামায় রয়েছে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের ১৮২৪ শতক জমি
নির্বাচনের আগে থেকেই শিল্পপতি মীর শাহে আলম
ষ্টাফ রিপোর্টার
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারণাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দাখিল করা হলফনামা ও পারিবারিক ব্যবসার বর্তমান অবস্থা বলছে ভিন্ন চিত্র।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এছাড়াও বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা থেকে লিখিতভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটোরাইস মিল ৪২ কোটি টাকায় বিক্রিও করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মীর পরিবার অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী পরিবার হিসেবে পরিচিত। প্রতিমন্ত্রীর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। নতুন করে নয় আওয়ামী শাসনামলেও শিল্পপতি হিসেবেই পরিচিতি ছিল মীর শাহে আলমের।
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, রোমা অটো রাইস মিল, রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড, রূপসী ফ্লাওয়ার মিল, মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, মীর লাবনী-সুনাত ফিলিং স্টেশন, মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি, উত্তর বাংলা ওভারসিজ লিমিটেড, রূপসী কৃষি খামার, রূপসী মৎস্য খামার, রূপসী কংক্রিট ব্রিকস ফ্যাক্টরি, রূপসী মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং রূপসী প্রাণী খামার।
প্রতিমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান জানান, মীর শাহে আলম শপথ নেওয়ার পর সরকারি বিধি মেনে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে পারিবারিক ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্হাপনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার, পরিচালনা ও সার্বিক মালিকানাসহ যাবতীয় দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যবসার পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের আগে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটোরাইস মিলটি ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। বিক্রয় কার্যক্রম নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। মিলটির ক্রেতা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার গণেশপুর গ্রামের রাইস মিল ব্যবসায়ী রবিউল আলম।
যে প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী রবিউল আলম বলেন, গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে ৪২ কোটি টাকায় মিলটি তিনি ক্রয় করেছেন এবং মালামালসহ প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব বুঝেও নিয়েছেন।
এদিকে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর সম্পদ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন সমালোচনার জন্ম দেয়। হলফনামায় ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি ও ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকলেও প্রতিবেদনে মাত্র ৩১ শতাংশ সম্পত্তির তথ্য উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর নামে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি ক্রয়ের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান। তিনি জানান, আলোচিত জমিটি ব্যক্তি হিসেবে মীর শাহে আলমের নামে নয়; বরং রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডের নামে ক্রয় করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি৷
প্রতিষ্ঠানগুলোর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নামে কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা জমি ক্রয়ের প্রশ্নই আসে না।
শিবগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, মীর শাহে আলম বহু বছর ধরেই এ অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্যবসার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানি। একটি মহল প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্যই এমন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি৷
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রউফ রুবেল বলেন, প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, শিরোনামের সঙ্গে প্রতিবেদনের উপস্থাপিত তথ্যের যথেষ্ট সামঞ্জস্য ছিল না। হলফনামার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পর্যালোচনা না করে আংশিক অংশ প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে মাত্র। এ ধরনের ঘটনায় যাচাই-বাছাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা উচিত বলে জানান তিনি।
এদিকে দায়িত্ব নেয়ার পর একের পর এক মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তার সংসদীয় আসন বগুড়া-২ এর সাধারণ ভোটাররা জানান, মীর শাহে আলম আজ একদিনে প্রতিমন্ত্রী হননি। তৃণমূলের রাজনীতি করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজ এই পর্যন্ত এসেছেন। সুদিনে নয় বরং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্দিনের আস্থাভাজন সঙ্গী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন একাধিকবার। সরকার গঠনের পর থেকে সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে তিনি যেভাবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন এতে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বিতর্কিত করার হেয় প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে যে ঘটনাগুলোতে তারা অত্যন্ত মর্মাহত। স্থানীয়রা বলেন, মানুষ কাজ করলে তার ছোটখাটো ভুল হবেই তবে তথ্য বিভ্রান্তি ঘটিয়ে যারা প্রতিমন্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা অবশ্যই পিছিয়ে পড়া বগুড়ার উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত। জনগণের দাবি, বিগত ১৭ বছর দেশের অন্যান্য স্থানে যে উন্নয়ন হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের প্রাপ্য উন্নয়নটুকু শুধু তারা দাবি করেছেন, তাদের সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার জন্য মীর শাহে আলম চেষ্টা করে যাবেন এটাই স্বাভাবিক এটিকে ভিন্নভাবে প্রচারের তীব্র নিন্দা জানান তারা।