বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলের কর্মসূচি থাকবে, সরকারের সমালোচনা থাকবে-এতে কোনো আপত্তি নেই। তবে শুধু কর্মসূচি না দিয়ে দেশের সংকট সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনা ও পরামর্শও দিতে হবে।
তিনি বলেন, আপনারা গ্যাস, বিদ্যুতের জন্য লংমার্চ করবেন, কর্মসূচি দেবেন-ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা একটা অল্টারনেটিভ বলুন, আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ কীভাবে সরবরাহ করব, কোথা থেকে পাবো, কীভাবে পাবো। আপনারা একটা পরিকল্পনা দিন, কী কী কাজ করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
রিজভী বলেন, পার্লামেন্টে বিরোধীদলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। সরকারের সমালোচনা তারা করবেন, সংসদের বাইরেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবেন-এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। তবে সমালোচনার পাশাপাশি সরকারকে কীভাবে সংকট মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু কর্মসূচির কথা শুনছি। বিরোধীদলের কর্মসূচি থাকবে, এটা গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু অতীতের পুনরাবৃত্তি করলে সেটা আবার অতীতের সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাবে। এতে অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটও রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতে সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, এটা সরকারের নিজস্ব কোনো কারণে হয়েছে, তা তো নয়। এখন বৈশ্বিক যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ করছে, এর দায় কি বাংলাদেশের সরকারের? তা তো নয়।
রিজভী বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো, কলকারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এ অবস্থায় সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটা পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা আমার মনে হয় ঠিক হবে না। বরং কীভাবে এই সংকট নিবারণ করা যায়, সেই বিষয়ে পরিকল্পনা দিতে হবে।
নৃত্য সম্পর্কে নিজের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান না থাকার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, গান ও বাদ্যের সঙ্গে যখন নৃত্য মঞ্চস্থ হয়, তখন তা দেখতে ভালো লাগে এবং মানুষের মন নির্মল হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, গীত ও বাদ্যের ছন্দে শরীরের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে ভাব, অনুভূতি ও চিত্রকল্প তৈরি হয়, সেটিই নৃত্যের ললিতকলা। যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধারায় নৃত্য বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশেরও রয়েছে সমৃদ্ধ লোকজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
রিজভী বলেন, শাস্ত্রীয়, লোকজ ও আধুনিক নৃত্যের পাশাপাশি লেটো দল, কবিগান, ঘুমুরা ও বাউল সংস্কৃতির মধ্যেও গান, অভিনয় ও শরীরের অঙ্গভঙ্গির সমন্বয় রয়েছে। এসব ঐতিহ্যকে ধারণ করে সময়ের সঙ্গে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, নৃত্যকলা অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম। গান ও নৃত্যের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়, তা অনেক সময় বড় আন্দোলনকেও শক্তিশালী করে।
জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, গান ও নৃত্য মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করে আন্দোলনের স্রোতকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
তিনি বলেন, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানের সঙ্গে যখন নৃত্য পরিবেশিত হয়, তখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়। সামনে যত বাধা বা ব্যারিকেড থাকুক, তা অতিক্রম করার সাহস তৈরি করে।
রিজভী বলেন, বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের ভালো দিকগুলো ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যের নামে থাকা অমানবিক ও বৈষম্যমূলক প্রথাগুলো পরিহার করতে হবে।
সতীদাহ প্রথার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে সমাজে অনেক অমানবিক প্রথা ছিল, যেগুলোকে কখনো কখনো গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যমের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়েছে। এখন সেই ধরনের অমানবিকতা থেকে বেরিয়ে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের বার্তা সংস্কৃতির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, ঐতিহ্য অনুযায়ী ভালো বিষয়গুলো বাদ যাবে না। শুধু অন্ধকার দিকগুলো আমাদের সরিয়ে দিতে হবে।
রিজভী আরও বলেন, শিল্প, সংগীত, নৃত্য ও সংস্কৃতির প্রতিটি শাখার নিয়মিত চর্চা সমাজে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করে। সাংস্কৃতিক চর্চা হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও অন্ধকার মানসিকতার বিরুদ্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি ফারহানা বেবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমদ উজ্জ্বল, সহ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদুর রহমান (সাইদ সোহরাব), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন প্রমুখ
অনুষ্ঠানের শেষে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়।