একসময় মেলা মানেই ছিল সার্কাস।বিশাল তাঁবু, রঙিন আলো, মাইকের ঘোষণা আর ঢোলের শব্দে মুখর হয়ে উঠত মেলার মাঠ। সন্ধ্যা নামলেই পরিবার নিয়ে সার্কাসের তাঁবুর দিকে ছুটতেন মানুষ। কেউ অপেক্ষা করতেন দড়ির ওপর খেলোয়াড়ের ভারসাম্য দেখার জন্য, কেউবা মোটরসাইকেলের মৃত্যুকূপ কিংবা নানা কসরত দেখার জন্য।
সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। মেলার মাঠে সার্কাসের সেই দাপট এখন আর নেই। অনুমতির জটিলতা, মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দর্শক কমে যাওয়া, শিল্পী সংকট এবং নাচ-গানের বাড়তি চাহিদায় ধুঁকছে একসময়ের জনপ্রিয় এই বিনোদনশিল্প।
ঢাকার নবাবগঞ্জের দ্য লায়ন সার্কাস এরই একটি উদাহরণ। ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার্কাসের খেলা দেখিয়ে আসছে দলটি। বর্তমানে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় একটি মেলায় তাঁবু গেড়েছে তারা।
সার্কাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সুমন। তাঁর ভাষায়, সার্কাসশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আগে দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি সার্কাস ছিল। এখন কমে ১৭ থেকে ১৮টিতে নেমেছে। নিয়মিত চলে মাত্র ৫ থেকে ৬টি। করোনার সময় অনেক সার্কাস বন্ধ হয়ে গেছে। এখনো অনেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
তাঁর অভিযোগ, সার্কাসের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুমতির বিষয়টি। কোনো কোনো জায়গায় মেলার অনুমতি থাকলেও বিনোদনের অনুমতি না থাকায় সার্কাস চালানো যায় না। আবার রাজনৈতিক বিরোধ বা মেলায় ঝগড়া-বিবাদ হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা বন্ধ হয়ে যায়। এতে সার্কাসের শিল্পীদের বসে থাকতে হয়।
সুমনের প্রত্যাশা, মেলার অনুমতি থাকলে যেন সার্কাস চালানোর সুযোগও দেওয়া হয়। তাঁর মতে, মেলা চললে সার্কাসও চলুক। তাহলে এই শিল্পটা অন্তত বেঁচে থাকবে।
একসময় বছরের প্রায় ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন স্থানে খেলা দেখাতেন সার্কাসের শিল্পীরা। এখন অনুমতির জটিলতায় ছয় মাসও নিয়মিত খেলা দেখানো সম্ভব হয় না।
ফরিদপুরের মধুখালী এলাকার সার্কাস খেলোয়াড় শুকলাল প্রায় দীর্ঘ সময় ধরে এই পেশায় আছেন। তিনি বলেন, ১০-১২ বছর আগেও বছরে ১১ মাস পর্যন্ত খেলা দেখানো হতো। এখন নানা প্রতিকূলতার কারণে ছয় মাসও খেলা দেখানো সম্ভব হয় না। বছরের দীর্ঘ সময় মেলা না চলায় খেলোয়াড়দেরও অন্য পেশায় যেতে হচ্ছে।
একসময় সার্কাসের সাধারণ শ্রমিকদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। আর দক্ষ খেলোয়াড়েরা পেতেন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এখন নিয়মিত খেলা না থাকায় অনেক শিল্পীর আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শুধু অনুমতির জটিলতা নয়, দর্শকের রুচির পরিবর্তনকেও সার্কাসশিল্পের সংকটের অন্যতম কারণ মনে করছেন শিল্পীরা।
শুকলাল বলেন, দর্শক এখন সার্কাসের খেলার চেয়ে নাচ-গানের দিকে বেশি আগ্রহ দেখান। তাঁর মতে, অশ্লীল নৃত্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূল সার্কাসের খেলাগুলো অনেকটা আড়ালে চলে যাচ্ছে।
এতে সার্কাসের চরিত্রও বদলে যাচ্ছে। দর্শক ধরে রাখতে মালিকদের অনেক সময় নাচের আয়োজন করতে হয়। ফলে মূল খেলার মান ও গুরুত্ব কমছে।
শুকলালের ভাষায়, ‘খেলার চাহিদা কম, নাচের চাহিদা বেশি। এই বিষয়টিও সার্কাসের জন্য সমস্যা।’
আরেক শিল্পী রিমা আক্তার ইতির অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। ছোটবেলা থেকেই সার্কাসে আছেন ইতি। তাঁর বাবা-মাও সার্কাসে খেলতেন। তাঁরা মারা যাওয়ার পরও এই পেশা ছাড়েননি তিনি। সার্কাসের আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসার।
তাঁর অভিজ্ঞতায়, সার্কাস দেখতে এসে দর্শকেরা কয়েকটি খেলা দেখার পরই নাচ চাইতে শুরু করেন। দর্শক না থাকলে আয়ও থাকে না। তাই অনেক সময় মালিককে দর্শকের চাহিদার কাছে বাধ্য হতে হয়। আগের তুলনায় নতুন অনেক খেলা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু খেলার মান আগের মতো নেই। নাচের মানটাই বেশি চলে, বলেন ইতি।
সার্কাসের সংকটের সবচেয়ে বড় ছাপ পড়েছে শিল্পীদের পরিবারে। একসময় একটি পরিবারের একাধিক সদস্য সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তাঁদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
ইতি বলেন, আগে পরিবারের সবাই সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন সবাই এই পেশা ছেড়ে গার্মেন্টসে কাজ করে। আমি একাই আছি সার্কাসে। তাঁর স্বামী এখন দোকান করেন। তিনিও আর সার্কাসে খেলা দেখান না। তাঁদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে।
তবুও এই পেশা ছাড়তে চান না তিনি। কারণ সার্কাসই তাঁর শৈশব, পরিচয় ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বছরের বড় একটি সময় সার্কাস বন্ধ থাকায় শিল্পীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন। কেউ গার্মেন্টসে, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
এর ফলে নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। পুরোনো শিল্পীরাও একসময় সার্কাস ছেড়ে দিলে দক্ষ খেলোয়াড়ের সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
কণ্ঠশিল্পী লিজা সরকার প্রায় ১৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরও একই অভিজ্ঞতা। বছরের বেশির ভাগ সময় সার্কাস বন্ধ থাকে। অনুমতি পাওয়া যায় না। আমার ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে। তাদের এই পেশায় আনব না।
তবে সার্কাসশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি পুরোপুরি হতাশ নন। সরকারি সহায়তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে আবারও এই শিল্পের জৌলুশ ফিরতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
একসময় সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাঘ, ভাল্লুকসহ বিভিন্ন প্রাণীর খেলা। দর্শকের ভিড় টানতে এসব প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে এখন অনেক সার্কাসে বন্যপ্রাণী দেখানো সম্ভব হয় না।
সার্কাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্যপ্রাণীর প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি আরও অনেক পুরোনো খেলা হারিয়ে গেছে। ফলে সার্কাসের খেলার সংখ্যা কমেছে, কমেছে বৈচিত্র্যও।
তবে সার্কাসকে তাঁরা যাত্রা বা পুতুলনাচের সঙ্গে এক করে দেখতে নারাজ। তাঁদের মতে, এটি একটি শারীরিক কসরত ও দক্ষতার বিনোদন, যা পরিবারের সবাই একসঙ্গে উপভোগ করতে পারেন।
দ্য লায়ন সার্কাসের ইতিহাস ১২০ বছরেরও বেশি সময়ের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে বিনোদন দিয়ে আসছে দলটি। কিন্তু এখন সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
সার্কাসের শিল্পীরা বলছেন, তাঁদের মূল চাওয়া খুব বেশি নয়। নিয়ম মেনে সার্কাস পরিচালনার সুযোগ, মেলার সঙ্গে সমন্বয় করে বিনোদনের অনুমতি এবং সরকারি সহায়তা পেলে তাঁরা আবার মাঠে ফিরতে চান।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সার্কাস মালিকরা সরাসরি উপজেলায় যোগাযোগ করলে বিস্তারিত খোজ নিয়ে সহোযোগিতা করার চেষ্টা করব।