প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২২
সার্কাসে হাসির কারিগর জোকার, তাবুর বাহিরে বিবর্ণ জীবন
এনামুল হক, বিশেষ সংবাদদাতা
জোকার অভিনেতা রিপন ও রুহুল আমিন। ছবি- এনামুল হক/চাঁদনী বাজার
মুখে রঙ-বেরঙের মেকআপ, নাকে নকল লাল নাক, পরনে বিচিত্র পোশাক। কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার অভিনয়, কখনো অদ্ভুতভাবে হাঁটাচলা। মুখে কোনো সংলাপ নেই, শুধু শারীরিক কসরত আর অঙ্গভঙ্গিতে দর্শকদের হাসানোর চেষ্টা। তাঁর কাণ্ড দেখে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় শিশুরা। হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠে সার্কাসের মঞ্চ।
এই মানুষটির নাম মো. রিপন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত তিনি। নাটোরের বনলতা সেন এলাকার বাসিন্দা রিপন বর্তমানে ঢাকার নবাবগঞ্জের ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা দ্য লায়ন সার্কাসের সঙ্গে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় এসেছেন।
সার্কাসে রিপনের পরিচয় জোকার বা ক্লাউন হিসেবে। তাঁর কাজ দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। শরীরী কসরত, পড়ে যাওয়ার অভিনয়, অদ্ভুত হাঁটাচলা ও মজার অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দর্শকদের হাসান তিনি। বল, রিংসহ বিভিন্ন জিনিস বাতাসে ছুড়ে জাগলিং ও ভারসাম্যের খেলাও দেখান।
জোকারির পাশাপাশি হাই জাম্প, লং জাম্প, ডিগবাজি ও রডের খেলাসহ আরও কিছু খেলা জানেন রিপন। সার্কাসের মঞ্চে দর্শকদের হাসতে দেখাই তাঁর কাছে আনন্দের।
রিপন বলেন, ‘আমরা শিল্পীগোষ্ঠী এই জগতটা ধরে রাখতে চাই। জোকারি করতে ভালো লাগে। মানুষ হাসানো আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অভিনয় দেখে দর্শক হাসে, এটা আমাদের ভালো লাগা।’
তবে সার্কাসের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও এই পেশায় এখন আগের মতো কাজ নেই। রিপনের ভাষ্য, ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও সার্কাসে অনেক কাজ ছিল। এখন খেলা কমে গেছে। মেলাও আগের মতো ভালো চলে না, সার্কাস দেখতে দর্শকের সংখ্যাও কমেছে।
কাজ থাকলে দিনে প্রায় এক হাজার টাকা সম্মানি পান তিনি। কাজ না থাকলে আয়ও থাকে না। রিপন বলেন, ‘সার্কাসের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভালো আছি। তবে খেলা না থাকলে খারাপ লাগে।’
রিপনের মতোই প্রায় ৩০ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত রুহুল আমিন। তাঁর কাছেও সার্কাস শুধু পেশা নয়, ভালোবাসার জায়গা। তবে তাঁর চোখেও এখন সার্কাসের আগের সেই জৌলুস নেই।
রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা মানুষকে আনন্দ দিই, নিজেরাও আনন্দ পাই। সার্কাসের আগের জৌলুস আর নেই।’
তিনি জানান, ১৫ বছর আগেও বছরে প্রায় ১০ মাস সার্কাসে খেলা থাকত। এখন তা কমে প্রায় পাঁচ মাসে দাঁড়িয়েছে। কাজ না থাকলে বাড়িতে বসে থাকতে হয়। কখনো ছোটখাটো কাজ পেলে তা করে কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়।
সার্কাসের শিল্পীদের আরেকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন রুহুল আমিন। তাঁর ভাষ্য, অনেক সময় মেলার অনুমতি পাওয়া গেলেও সার্কাসের অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার সার্কাসের অনুমতি মিললেও মেলার অনুমতি পাওয়া যায় না। এভাবে তাঁদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
একসময় সার্কাস ছিল গ্রাম ও শহরের মানুষের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন। সার্কাসের তাঁবু বসলে শিশুদের পাশাপাশি বড়দের মধ্যেও তৈরি হতো ব্যাপক আগ্রহ। দাঁতের খেলা, ভার উত্তোলন, রশির ওপর হাঁটা, ট্র্যাপিজ ও ঝুলন্ত খেলা, জাগলিং, জোকারের কৌতুক, জাদুর খেলা, চাকা ও রিংয়ের খেলা এবং মোটরসাইকেলের ‘গ্লোব অব ডেথ’ ছিল সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ।
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বিনোদনের নতুন মাধ্যমের বিস্তার, দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সার্কাসের আয়োজনও কমেছে। একসময় সার্কাসে থাকা বন্য পশুপাখির খেলাও এখন নেই। আইনি জটিলতার কারণে এ ধরনের খেলা বন্ধ হয়েছে। ফলে পুরোনো সার্কাসের একটি পরিচিত আকর্ষণও হারিয়ে গেছে।
রুহুল আমিন বলেন, ‘আগের মতো আনন্দ নেই। সার্কাসের বিনোদন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।’
শেরপুরে এখনো সার্কাসের তাঁবুতে দর্শকদের জন্য চলছে নানা আয়োজন। মঞ্চে জোকারের কৌতুক দেখে দর্শকেরা হাসছেন, হাততালি দিচ্ছেন। কিন্তু দর্শক চলে যাওয়ার পর শিল্পীদের সামনে থেকে যাচ্ছে কাজ ও আয়ের অনিশ্চয়তা।
রুহুল আমিনের কথায়, এখন মঞ্চে মানুষ হাসালেও দিন শেষে নীরব কান্না চলে আসে।
প্রায় ৩৫ বছর ধরে সার্কাসে থাকা রিপন এবং ৩০ বছর ধরে এই পেশায় থাকা রুহুল আমিনের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, শুধু সার্কাসের দর্শকই কমেনি, কমেছে তাঁদের কাজের সুযোগও।