বগুড়া মহানগরের ব্যস্ততম সড়ক স্টেশন রোড এলাকায় ফুটপাত দখল করে ফলের খাঁচা ও ক্যারেট রাখায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারীরা। সড়কের পাশে ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে দুই সারি করে ফলের খাঁচা, ক্যারেট ও বিভিন্ন সামগ্রী রাখা হয়েছে। আবার কোথাও ফুটপাতের ওপর বাঁশের কাঠামো তৈরি করে স্থায়ীভাবে ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বগুড়া মহানগরের স্টেশন রোড অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়ক দিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে যাতায়াত করা হয়। স্টেডিয়াম থাকায় এই সড়ক দিয়ে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দেরও চলাচল করতে হয়। কয়েক মাস আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সড়ক পরিদর্শনে এসে স্টেশন রোড সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে এখনো এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিয়ম করা হলেও তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফুটপাত ও হকার উচ্ছেদে অভিযান মূলত সাতমাথাকেন্দ্রিক হলেও অন্য সড়কগুলোতে তেমন অভিযান দেখা যায় না। সাতমাথায় অভিযান চালানো হলেও কিছুক্ষণ পর আবারও ফুটপাত দখল হয়ে যায়। শুধু স্টেশন রোডের ফুটপাত নয়, মহানগরের অধিকাংশ ফুটপাতই বিভিন্ন ব্যবসায়ীর দখলে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, স্টেশন রোড শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু কয়েকজন ফলের আড়তদার ও ব্যবসায়ী ফুটপাতের ওপর ফলের খাঁচা রেখে ব্যবসা পরিচালনা করায় পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফলের খাঁচা ও ক্যারেট ওঠানামা, ক্রেতাদের ভিড় এবং রাস্তার পাশে পণ্যসামগ্রী রাখার কারণে সড়ক ও ফুটপাতের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি ফুটপাতের পাশে ফলের দোকানদার ও ক্রেতাদের গাড়ি রাখায় মূল সড়কের জায়গাও দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
পথচারীরা বলেন, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য হলেও সেখানে পণ্যসামগ্রী রাখা হলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে হাঁটার সুযোগ হারান। স্টেশন রোডের দক্ষিণ পাশের ফুটপাতে দুই সারি করে ফলের ক্যারেট রাখায় পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। চলাচলের সময় একজনের শরীরের সঙ্গে আরেকজনের ধাক্কা লাগছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁরা ফলের খাঁচা রাখেন। তবে পথচারীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফুটপাত দখল না করে নির্দিষ্ট স্থানে ফলের খাঁচা রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি পরিদর্শন করে ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিক। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য শহরের তিনমাথা বা মাটিডালি এলাকায় নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ করা হলেও ব্যবসায়ীরা সেখানে যাচ্ছেন না। নির্ধারিত স্থানে ব্যবসায়ীরা চলে গেলে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা এবং পথচারীদের চলাচল—দুই দিকই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
গত ২৭ জুলাই বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বগুড়া জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহানগরের যানজট, বিশেষ করে সাতমাথাকেন্দ্রিক যানজট নিরসনের লক্ষ্যে দেশি ফলের আড়ত তিনমাথায় স্থানান্তর করে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তিনমাথার আড়ত ছাড়া সাতমাথা থেকে রেলস্টেশন পর্যন্ত দেশি ফল কেনাবেচা না করার জন্য ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নির্দেশনা অমান্য করা হলে যানজট নিরসনে বগুড়া সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাসহ অবৈধভাবে যানজট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
এর আগে, ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোছা. আফসানা ইয়াসমিন বগুড়া স্টেশন রোড থেকে সব দেশি ফলের দোকান সরিয়ে শহরের তিনমাথায় স্থাপিত ফলের মার্কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৬ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম স্টেশন রোড থেকে দেশি ফলের দোকান সরিয়ে দেওয়ার জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেন। তবে অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘদিনেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সচেতন মহলের প্রত্যাশা, বগুড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন রোডের ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, ফুটপাত দখল ও অযথা যানজট সৃষ্টিকারীদের নোটিশ দিয়ে এবং মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। এখন প্রতিদিনই সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখলকারীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আজ সোমবার শহরের চারমাথা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌফিকুর রহমান জানান, ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার অভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে উচ্ছেদ করা হলেও তাঁরা আবারও ব্যবসা শুরু করছেন। গত মাসেও স্টেশন রোডে অভিযান চালানো হয়েছিল। স্টেশন রোড থেকে দেশি ফলের দোকান সরিয়ে শহরের তিনমাথা ও মাটিডালি এলাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থাকলেও ব্যবসায়ীদের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। অচিরেই স্টেশন রোড থেকে দেশি ফলের দোকানগুলো স্থানান্তর করা হবে।