বগুড়ায় আদালতের কার্যক্রম শেষে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে জোর করে কালো রঙের একটি হাইস গাড়িতে তোলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। এ সময় ধস্তাধস্তিতে তরুণীর পোশাক ছিঁড়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে হট্টগোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে বগুড়া সদর থানায় নিয়ে যান।
সোমবার ২৬ অক্টোবর দুপুরে বগুড়ার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে এ ঘটনা ঘটে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, তাসনিম রানা তামান্না নামের ওই তরুণীর বয়স সোমবার ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় তাকে রাজশাহী সেফ হোম থেকে বগুড়ার আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তার বাবা-মা তাকে নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার আবেদন করেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বাবা-মায়ের সঙ্গে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন তামান্না। তার পক্ষের আইনজীবীও তাকে নিজের জিম্মায় দেওয়ার আবেদন জানান।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদমদীঘি থানা আমলি আদালতের বিচারক আবু হেনা সিদ্দিকী তামান্নাকে নিজের জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেন। আদালতের কার্যক্রম শেষে বের হওয়ার সময় তামান্না আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হলে তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টরকে ডেকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরে পুলিশি প্রটোকলে কোর্ট ইন্সপেক্টর, বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইব্রাহীম আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদালত ভবন থেকে বের হন তামান্না।
প্রত্যক্ষদর্শী আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের ফটক পার হওয়ার পর তার বাবা-মা ও তাঁদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন তামান্নাকে একটি কালো রঙের হাইস গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় তামান্না চিৎকার করে তাঁদের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানান। টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে তার পোশাক ছিঁড়ে যায় বলে অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কোর্ট ইন্সপেক্টর, বগুড়া সদর থানার ওসি ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তামান্নাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান।
তামান্নার বাবা সাময়িক বরখাস্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. রানা মাসুদ অভিযোগ করেন, আদালতে মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির কথা থাকলেও আসামিপক্ষের লোকজন ও আইনজীবীরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
তামান্নার সৎমা মোছা. সুরাইয়ার দাবি, আদালতের আদেশের পর বাইরে আসার সময় তাঁরা শুধু মেয়ের হাত ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আসামিপক্ষের লোকজন ও এক আইনজীবী তাঁদের ওপর চড়াও হন এবং তাঁকে মারধর করেন। মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পাচার বা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা থেকে তাঁরা তাকে নিজেদের জিম্মায় নিতে চেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী জানান, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিরাপত্তা এবং আদালত প্রাঙ্গণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে তামান্না সদর থানায় আইনি নিরাপত্তায় রয়েছেন।
ওসি আরও জানান, তামান্নার সঙ্গে যার বিয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেই সাহেদ হোসেনের বিরুদ্ধে রানা মাসুদ দুটি অপহরণ মামলা করেছেন। ওই মামলাগুলোর অভিযুক্ত সাহেদ বর্তমানে পলাতক।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তামান্না নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার বাবা আদমদীঘি থানায় মামলা করেন। পরে তামান্না ও সাহেদ হোসেন ফেসবুক লাইভে এসে তাঁদের বিয়ে হয়েছে বলে জানান এবং তাঁদের খোঁজাখুঁজি না করার অনুরোধ করেন।
এরপর সাহেদের বিরুদ্ধে দুটি অপহরণ মামলা করেন তামান্নার বাবা। পরে গোয়েন্দা পুলিশ তামান্নাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাবার হেফাজতে দেয়। সেখান থেকে আবারও চলে যাওয়ার পর তাঁকে উদ্ধার করে আদালতের মাধ্যমে রাজশাহী সেফ হোমে রাখা হয়।