প্রকাশিত : ১০ জুলাই, ২০২৬ ০১:২৫
পাঠকের কলাম

বগুড়ার ভেষজ ঐতিহ্য :কুসংস্কার নয়,গবেষণার বিষয়

কৃষিবিদ মোঃ মোস্তফা ফয়সালঃ
বগুড়ার ভেষজ ঐতিহ্য :কুসংস্কার নয়,গবেষণার বিষয়
ছবি- AI Generated

করতোয়া ও যমুনা অববাহিকার উর্বর ভূমি, বিল-ঝিল, গ্রামীণ বনাঞ্চল ও বসতবাড়ির আঙিনা—সব মিলিয়ে বগুড়া অঞ্চল বহুদিন ধরেই নানা ধরনের ঔষধি উদ্ভিদের এক সমৃদ্ধ আবাস। এক সময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে নিম, তুলসী, বাসক, থানকুনি, কালমেঘ, ঘৃতকুমারী, গুলঞ্চ কিংবা অর্জুনের মতো গাছ দেখা যেত। জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটের সমস্যা, ক্ষত বা ত্বকের নানা সমস্যায় এসব উদ্ভিদ ব্যবহার ছিল সাধারণ ঘটনা। আধুনিক চিকিৎসার প্রসারের ফলে সেই চর্চা অনেকটাই কমে এলেও ভেষজ চিকিৎসার প্রতি মানুষের আগ্রহ আজও কমেনি। বরং প্রশ্ন উঠছে এই লোকজ জ্ঞানের পেছনে কি সত্যিই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, নাকি এগুলো কেবল কুসংস্কারের অংশ? 

এর উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, বিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হবে। বিজ্ঞান বলছে, লোকজ চিকিৎসার সব দাবি সত্য নয়, আবার সবকিছুকেই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। বহু ভেষজ উদ্ভিদে এমন প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা প্রদাহ কমাতে, কিছু জীবাণুর বৃদ্ধি দমন করতে, ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করতে এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে আজও ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ঐতিহ্যভিত্তিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। তবে সংস্থাটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে, কোনো ভেষজ উদ্ভিদকে চিকিৎসায় ব্যবহার করার আগে তার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও মান বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা অপরিহার্য। 

বগুড়া অঞ্চলে বহুল ব্যবহৃত বাসক (Justicia adhatoda) কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবেষণায় এর কফ নির্গমনে সহায়ক উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। থানকুনি (Centella asiatica) ক্ষত নিরাময় ও ত্বকের পুনর্গঠনে সম্ভাবনাময় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ঘৃতকুমারী (Aloe vera) পোড়া ও ত্বকের ক্ষতের পরিচর্যায় বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়। আবার নিম (Azadirachta indica)-এর জীবাণুর বৃদ্ধি দমনকারী বৈশিষ্ট্য এবং কালমেঘ (Andrographis paniculata)-এর প্রদাহনাশক সম্ভাবনা নিয়েও বহু গবেষণা হয়েছে। 

শুধু আন্তর্জাতিক গবেষণাই নয়, বগুড়া জেলার লোকজ চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। স্থানীয় কবিরাজদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে পরিচালিত নৃ-উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, এ অঞ্চলে বহু উদ্ভিদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষকেরা মনে করেন, এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মূল্যবান সূত্র হতে পারে। তবে এসব ব্যবহারকে আধুনিক চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে অবশ্যই পরীক্ষাগার গবেষণা, বিষাক্ততা নিরূপণ এবং মানবদেহে নিয়ন্ত্রিত গবেষণার মাধ্যমে কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে ভেষজ চিকিৎসা নিয়ে নানা বিভ্রান্তিও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, কোনো একটি গাছ ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করতে পারে। কোথাও বলা হয়, সাপের কামড় বা গুরুতর সংক্রমণে হাসপাতালে না গিয়ে শুধু ভেষজ ব্যবহারই যথেষ্ট। এ ধরনের দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এসব ভুল ধারণা রোগীকে সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। 

অন্যদিকে, লোকজ জ্ঞানকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। প্রকৃতির ভাণ্ডারে লুকিয়ে থাকা বহু উপকারী উপাদান প্রথমে মানুষের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই চিহ্নিত হয়েছে। পরে গবেষণাগারে সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে আধুনিক ওষুধ তৈরি হয়েছে। তাই বগুড়ার ভেষজ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে তার মূল্যায়ন। 

বগুড়ায় নবপ্রতিষ্ঠিত বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে এ অঞ্চলের ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে জন্মানো উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান, ঔষধি গুণাগুণ, নিরাপদ ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা বাড়ানো গেলে তা শুধু বগুড়া নয়, পুরো দেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। 

বগুড়ার ভেষজ ঐতিহ্য কেবল আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়, এটি সম্ভাবনাময় বৈজ্ঞানিক সম্পদও। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই জ্ঞানভান্ডারের একটি অংশ ইতোমধ্যে আধুনিক গবেষণায় সমর্থন পেয়েছে, আবার অনেক দিক এখনও অনুসন্ধানের অপেক্ষায়। তাই ভেষজ উদ্ভিদকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও যেমন সমীচীন নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কুসংস্কার বলে প্রত্যাখ্যান করাও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন সুপরিকল্পিত গবেষণা, কঠোর বৈজ্ঞানিক যাচাই এবং প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন। গবেষণাই নির্ধারণ করবে কোন উদ্ভিদ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, কোনটি সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী, আর কোনটি কেবল লোকজ বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বগুড়ার ভেষজ ঐতিহ্য তাই অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কারের এক সম্ভাবনাময় দিগন্ত। 

 

লেখক: কৃষিবিদ মোঃ মোস্তফা ফয়সাল, উপাচার্যের একান্ত সচিব, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় 

উপরে