প্রকাশিত : ১ মে, ২০২৬ ১১:৩৪

আগামী দুই বছর ‘কঠিন’ হবে, অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হতে পাওে : অর্থমন্ত্রী

চাঁদনী ডিজিটাল ডেস্ক রিপোর্টঃ
আগামী দুই বছর ‘কঠিন’ হবে, অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হতে পাওে : অর্থমন্ত্রী

দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে আছে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী দুই বছর ‘কঠিন সময়’ যেতে পারে।
তিনি এও বলেছেন, এই সময়ে সরকারকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে, যা জনপ্রিয় নাও হতে পারে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দুই বছর হয়তো কষ্ট করা লাগবে।
“আগামী দুই বছর কঠিন হবে। অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেকগুলো পদক্ষেপ নেব, যেগুলো জনপ্রিয় নাও হতে পারে।”
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট দেখা দেয়।
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের দেড় দশকের শাসনকালে দেশের ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতে ‘দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচার’ হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের অর্থনীতির হালচাল জানতে শ্বেতপত্র প্রণয়ন করা হয়েছিল।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের বেশ কয়েক শিল্পগ্রুপ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেছে। সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার মতো ব্যবস্থাও নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানযুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে চাপে পড়ে বিএনপির নতুন সরকার।
সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে এমন এক নিম্নস্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে একে আবার ওপরে তুলতে হলে কঠিন সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে এবং কাঠামোগত পরিবর্তন আনতেই হবে।
খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের ওপরে
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে খেলাপি ঋণ এখন ৩০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। তার মতে, কোনো দেশের খেলাপি ঋণ যখন ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন অর্থনীতির গতি প্রায় থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে এই হার ছিল ১৩ শতাংশ।
ঋণখেলাপি নিয়ে ব্যাখ্যা
আমির খসরু বলেন, সংসদে বিএনপির অনেক সদস্যকে ঋণখেলাপি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “ঋণ পুনঃতফসিলকরণ এটা ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং কালচারের মধ্যে সাধারণ প্রক্রিয়া। এটা বিএনপি আবিষ্কার করে নাই। যেদিন থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেদিন থেকেই ঋণ তফসিলীকরণের ব্যবস্থা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।”
গেল ৬ এপ্রিল সংসদে অর্থমন্ত্রী দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা সংসদে তুলে ধরেন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
ঋণ খেলাপি হওয়ার ব্যাখ্যায় আমির খসরু বলেন, ব্যবসায়িক বাস্তবতায় যেমন ঋণ পুনঃতফসিলের প্রয়োজন হয়, তেমনি রাজনৈতিক নির্যাতনের কারণেও অনেকে সে অবস্থায় পড়েন।
‘১৭ বছর বিএনপির ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেননি’
অর্থমন্ত্রী বলেন, “গত দীর্ঘ ১৭ বছরের বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির যারা ব্যবসায়ী আছে তারা কেউ ব্যবসা করতে পারে নাই।”
তিনি বলেন, “তাদেরকে ব্যাংকের অনুমোদন করা ঋণ পর্যন্ত দেওয়া হয় নাই। ঋণ অনুমোদন হয়ে গেছে, কিন্তু ঋণ দেওয়া হবে না। ঋণের সময় যখন শেষ হয়ে গেছে, ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হবে না।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, তাদের অনেকের অনুমোদিত ঋণ ছাড় হয়নি, ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতে পারেননি, অনেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, কারও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেকে কারাগারে ছিলেন।
তিনি বলেন, “এখন জেলে বসে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা কি এত সহজ ব্যাপার?”
‘বিএনপির কোনো ব্যাংক নাই’
আমির খসরু মাহমুদ বলেন, প্রচার আছে, কিছু রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ব্যাংক আছে। যাদের ব্যাংক আছে, তারা নিজেদের পছন্দের লোককে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অন্য পদে বসাতে পারেন। কিন্তু বিএনপির সে সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “বিএনপির কোন ব্যাংক নাই।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, “যাদের, যেই দলের ব্যাংক আছে তারা তো তাদের পছন্দের ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানিয়েছেন, তাদের পছন্দের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর বানিয়েছেন, তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ করেছেন। আবার তাদের অপছন্দের লোককে চাকরিচ্যুত করেছেন। এই কাজটি তো বিএনপি করতে পারবে না।”
রাষ্ট্রপতি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান
রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গ ধরে আমির খসরু বলেন, রাষ্ট্রপতির প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা থাক বা না থাক, রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই ব্যক্তি হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান করতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইজ অ্যান ইনস্টিটিউশন।”
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, “আপনি যদি কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেসি বিশ্বাস করেন, আপনাকে ইনস্টিটিউশনকে সম্মান করতে হবে।”
তিনি বিরোধী দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যারা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নিয়েছেন, তারাই এখন বিরোধী দলে বসে সেই প্রতিষ্ঠানের সম্মান অস্বীকার করছেন।
জুলাই সনদ ‘মাদার অ্যাগ্রিমেন্ট’
জুলাই সনদ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার আগে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখেছে।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদ হচ্ছে ‘মাদার অ্যাগ্রিমেন্ট’।”
তার ভাষায়, এখন কেউ কেউ ‘মাদার অ্যাগ্রিমেন্ট’ ছেড়ে তার ‘ছেলে-নাতি’ নিয়ে কথা বলছেন। অথচ বিএনপি জুলাই সনদ, ৩১ দফা ও নিজেদের নির্বাচনি অঙ্গীকার সামনে রেখেই ভোটে গেছে এবং জনগণ তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন দিয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদেই বলা আছে, যে দল নির্বাচনে জিতে আসবে, তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে। সরকার সেই পথেই চলছে।
বিদ্যুৎ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চলছে। এর সঙ্গে আরও ২০ থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে যে লুটপাট হয়েছে বিগত দিনে, তার ক্ষতি এখন আমাদের সকলকে বহন করতে হচ্ছে।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার সময় জ্বালানি তেলে ৫০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বকেয়া রেখে যাওয়া হয়েছিল। গ্যাস খাতে ৭৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের মেয়াদোত্তীর্ণ দেনাও ছিল।
তিনি বলেন, এগুলো এখন বর্তমান সরকারকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে জুন সময়কালে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে।
একইভাবে এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে জ্বালানি তেলে আরও ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হবে, বলেন তিনি।
বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইলেন অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে এমন নিচু সমতা থেকে তুলতে গেলে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে, যার কিছু জনপ্রিয় নাও হতে পারে। কিন্তু বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, “এটা দেশের স্বার্থে, সকলের স্বার্থে।”
বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান রেখে তিনি বলেন, এটি শুধু বিএনপির দেশ নয়, সবার দেশ। তাই অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বা আরও ভালো জায়গায় নিতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আমির খসরু বলেন, “কষ্ট হলেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারব, এবং আপনাদের সকলের সহযোগিতা দরকার।”

উপরে