শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বাড়তি বরাদ্দ- ৩ লাখ কোটি টাকার নতুন এডিপি অনুমোদন
এই প্রথম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল। আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) মূল এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন খরচসহ সার্বিক এডিপির আকার হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। চলমান এডিপির চেয়ে আগামী এডিপির আকার এক লাখ কোটি টাকা বাড়ছে।
সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় নতুন এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এনইসি সভায় সভাপতিত্ব করেন। শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
নতুন এডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এডিপিতে বরাদ্দ পাওয়া শীর্ষ পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে তিনটি হলো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দ আগের চেয়ে বেশ বেড়েছে।
এডিপির নথি অনুসারে, মূল এডিপিতে দেশজ উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প সহায়তা হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ১০৫।
সভা শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের এডিপি সম্পর্কে বলেন। তিনি বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, এ নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ড্যাশবোর্ড থাকবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এডিপি থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে কিছু নিয়মকানুন অনুসরণ করা হবে। প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকলে কেউ প্রকল্প পরিচালক হতে পারবেন না। অতীতে প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ আছে।
এডিপি উচ্চাভিলাষী কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক সরকারের উচ্চাভিলাষ থাকতে হবে। আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অতীতের সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বিনিয়োগ লাগবে। সে জন্য বড় এডিপি নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশহারেও সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ছিল। তারই ধারাবাহিকতা দেখা গেল প্রথম বাজেটে এডিপি বরাদ্দের ছকে।
তিন লাখ কোটি টাকার এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এ খাতে মোট বরাদ্দ ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।
এরপরই রয়েছে শিক্ষা খাত। সেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্যে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোটে বরাদ্দের ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ থোক ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের কর্মরতদের সম্মানী বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ররাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক কম বরাদ্দ এবং অর্থ খচরের সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্নীতি নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়ে আসছে।
এরকম বাস্তবতায় বাড়তি বরাদ্দ বাস্তবায়ন হবে কিনা এবং অর্থনীতির নানামুখি সংকটের মধ্যে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে এডিপির আকার নির্ধারণ ‘উচ্চাভিলাষী’ কিনা- সেই প্রশ্নে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “অবশ্যই। এইখানে আমরা কিন্তু সব কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষাক্ষাত এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এবং এই যুব সমাজের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এগুলো কিন্তু সবকিছু এক জায়গায়। এবং এই জায়গায় বাজেট না দিলে আমরা ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ারের যে কথাটা বলছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, এটার সাথে আরও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলেতো আপনাকে বাজেট দিতে হবে, তাই না?”
তিনি বলেন, “শিক্ষার বেলাতেও তাই। শিক্ষার কিন্তু আমরা বিস্তৃতিটা বাড়াচ্ছি, এখানে কিন্তু প্রচুর স্কিল ডেভেলপমেন্ট হবে। আপনার দক্ষতা বাড়ানো। এখানে প্রচুর ইনস্টিটিউশন হবে।”
কারিগরি শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার আশার কথা শুনিয়ে মন্ত্রী বলেন, “এতে দেশের ভিতরে ডিমান্ড মিট করবে, দেশের বাইরে তারা ডিমান্ড মিট করবে। এইখানে তো বিনিয়োগ করতে হবে। এবং কোন খাতে কত বিনিয়োগ করব, এটার রিটার্ন কী, এখান থেকে কত কর্মসংস্থান হবে, এগুলো তো আমরা হিসাব করেছি। হিসাব করে বিনিয়োগ করতে হবে। এখন বাস্তবায়ন হবে কি না- এটা তো অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবায়ন হবে কি না- বাস্তবায়ন তো করতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে আমরা আমাদের গ্রোথ অ্যাচিভ করব কীভাবে? আমরা কর্মসংস্থান অ্যাচিভ করব কীভাবে? আমার রপ্তানি বাড়বে কীভাবে? আমাদের শিল্পের প্রোডাকশন বাড়বে কীভাবে? এগুলো তো সবকিছু একটার সাথে একটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা আমরা করতে হবে সো ফার।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) প্রমুখ। আজকের এনইসি সভায় পাঁচ বছরের জন্য সংস্কার ও উন্নয়নের কৌশলকাঠামো পাস করা হয়।
