প্রকাশিত : ৩ জুলাই, ২০২৬ ০১:০৪

নজরুলের কর্ম মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

চাঁদনী ডিজিটাল ডেস্কঃ
নজরুলের কর্ম মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হবে:  প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম ও জীবনবোধ সরকারি অফিসের চার দেয়ালে আবদ্ধ না রেখে ‘মানুষের ঘরে’ পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাহীন ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে একদিকে যেমন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে, অপরদিকে মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার পথও উন্মুক্ত। এমন জটিল বাস্তবতায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি/সবার আগে কুসুম বাগে/উঠব আমি ডাকি’ কিংবা ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগৎটাকে/কেমন করে ঘুরছে মানুষ/যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে’- এ ধরনের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ছড়া বা কবিতা আমাদের উদীয়মান প্রজন্মের সামনে আশা জাগানিয়া আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি বলেন, “এ কারণেই কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে আবদ্ধ না রেখে তার সাহিত্যকর্ম, তার জীবনবোধ পৌঁছে দিতে হবে মানুষের ঘরে।”
বৃহস্পতিবার সকালে ‘নজরুল বর্ষ’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভা কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্যাপনের মাধ্যমে দেশে বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে। নজরুল বর্ষের সার্থকতা কামনা করছি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার (কাজী নজরুল ইসলাম) কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনই আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। শুধু অতীত ইতিহাস নয়, আজকের প্রজন্মের জন্য এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির, জীবন ও কর্মের সঙ্গে, গণমানুষ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরো গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।” তারেক রহমান বলেন, “‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের লক্ষ্যে আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনেক সরকারি কর্মকর্তাগণ উপস্থিত রয়েছেন। বেশ কয়েকজন নজরুল গবেষক এবং নজরুল সংগীত শিল্পীগণও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন। আপনাদেরকে অভিনন্দন। তবে একটি আধুনিক আবদ্ধ ঘরে বসে আজ যেভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করছি, স্মারক ডাক টিকেট এবং লোগো উন্মোচন করছি, এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে আমি একটু ভিন্নভাবেই আশা করেছিলাম।”
তিনি বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে- ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’; এর পরিবর্তে আমন্ত্রণপত্রে যদি লেখা থাকতো ‘সকল বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমীগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’, সেটি বরং বেশি যৌক্তিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে আমার বিশ্বাস।”
নিজের ভাবনা ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার এই উপলব্ধির কারণ হলো, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয়, “নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমী মানুষেরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ এটি যেমন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না, ঠিক একইভাবে, একই কারণে নজরুল বর্ষ উদযাপনে ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ কথাটিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেননি; তবে তার হৃদয় জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। কিশোরবেলায় ১৯১৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ময়মনসিংয়ের ত্রিশালে এসেছিলেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে- এ বর্ষটিকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে।”
কবি নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘প্রেমের কবি’, ‘বিরহের কবি’, ‘তারুণ্যের কবি’, ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি’ বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।
“পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, তথা যা কিছু অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দর; তার বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব বিদ্রোহ কিংবা রণ-সংগীত, ইসলামি তাহজিব-তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান, অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামা সংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উম্মাদনা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।”
মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও কাজী নজরুল ইসলামই প্রধান দিশারি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য- তার রচনার মধ্যে মহিমাময় সৌন্দর্য নিয়ে বাঙময় হয়েছে। কবি নজরুলের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য রয়েছে সকল কালের, সকল মানুষের। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা; প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রয়োজন ফুরানোর নয়।”
তিনি বলেন, “প্রতিটি রাষ্ট্র এবং সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, আমাদের সামাজিক দর্শন, আমাদের মনোজগতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।
“জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব; কৈশোর থেকে পরিণত বয়স, আমাদের জীবনের সকল পর্যায়েই তার প্রভাব অপরিসীম। কবি নজরুলের জীবন ও কর্ম, তার চিন্তা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কবি নজরুল নিজেও তার ‘অভয়-সুন্দর’ কবিতায় লিখেছেন—‘আমি গেলে যারা আমার পতাকা ধরিবে বিপুল বলে/সেই সে অগ্রপথিকের দল এসো এসো পথতলে’।”
‘নজরুল বর্ষ’ উদ্যাপনের বছরব্যাপী কর্মসূচি বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এর ফলে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, প্রকাশনা কার্যক্রম, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় কবির সৃষ্টিকে জনপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার উপলক্ষ্য তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমেও তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং তার সাহিত্য কর্ম আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো বিস্তৃতভাবে প্রচারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
“এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ তথা নজরুল প্রেমীদের নিয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে দেশের সকল জেলা-উপজেলা এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বছরজুড়ে প্রতিটি অনুষ্ঠান সফলভাবে পালন করা জন্য জরুরি বলেই আমি মনে করি। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক গবেষক সমাজ তথা বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে পড়বে নজরুলের সাহিত্যকর্ম। নজরুলের বিশ্বজনীন মানবিক বার্তাও তার সাহিত্য ও সংগীতের বহুভাষিক অনুবাদ এবং গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ব পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা নজরুল বিশেষজ্ঞ, তারা কবিকে নানা বিশেষণে ভূষিত করে থাকেন। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।
“আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেন, ‘গাহি সাম্যের গান/সেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/সেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অপশক্তি নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালেও সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমান কালের মূল্যবোধ। বর্তমান সরকারও এমন এক রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে...যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নির্বিঘ্নে নিরাপদে বসবাস করবে।
“শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও মানুষের হিংস্রতার শিকার হবে না, বর্তমান সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।”
তিনদিনের উদ্বোধনী আয়োজনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর লোগো এবং স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন করেন।
সচিবালয়ে এ অনুষ্ঠানে কবি নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজী উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদের মধ্যে ছিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, তথ্য ও সমপ্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊধর্তন কর্মকর্তারা।
এছাড়া কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি হাসান হাফিজ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আশরাফ উদ্দিন উজ্জল, হেলাল খান উপস্থিত ছিলেন।

উপরে